2026 মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমাধান
এই পৃষ্ঠায় ২০২৬ সালের মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সম্পূর্ণ সমাধান দেওয়া হলো। ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার্থে প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর ও ব্যাখ্যা নিচে সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিভাগ ‘ক’
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো: ১ × ২০ = ২০
১.১ “লেটারস ফ্রম এ ফাদার টু হিজ ডটার”- গ্রন্থে মোট চিঠির সংখ্যা কয়টি?
(ক) ২০টি
(খ) ২৫টি
(গ) ৩০টি
(ঘ) ৫০টি
উত্তর: (গ) ৩০টি
১.২ ‘জীবন স্মৃতি’ গ্রন্থটি লিখেছেন-
(ক) বিপিনচন্দ্র পাল
(খ) সরলাদেবী চৌধুরানী
(গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উত্তর: (ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১.৩ রামমোহন রায় ‘ব্রহ্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন-
(ক) ১৮১৫ খ্রিঃ
(খ) ১৮২০ খ্রিঃ
(গ) ১৮২৩ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮২৮ খ্রিঃ
উত্তর: (ঘ) ১৮২৮ খ্রিঃ
১.৪ ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন-
(ক) শিবনাথ শাস্ত্রী
(খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) উমেশচন্দ্র দত্ত
(ঘ) দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ
উত্তর: (গ) উমেশচন্দ্র দত্ত
১.৫ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়-
(ক) ১৮২৫ খ্রিঃ
(খ) ১৮৩০ খ্রিঃ
(গ) ১৮৩৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৪০ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৮৩৫ খ্রিঃ
১.৬ ভারতে প্রথম ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রণীত হয়-
(ক) ১৮৬৫ খ্রিঃ
(খ) ১৮৭০ খ্রিঃ
(গ) ১৮৭৮ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৮০ খ্রিঃ
উত্তর: (ক) ১৮৬৫ খ্রিঃ
১.৭ গয়া মুণ্ডা অন্যতম নেতা ছিলেন-
(ক) কোল বিদ্রোহের (১৮৩১-৩২)
(খ) সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫-‘৫৬)
(গ) মুণ্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০)
(ঘ) চুয়াড় বিদ্রোহের (১৯৯৮-৯৯)
উত্তর: (গ) মুণ্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০)
১.৮ উনিশ শতককে ‘সভা সমিতির যুগ’ বলেছেন-
(ক) ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার
(খ) ডিরোজিও
(গ) ডঃ সুরেন্দ্রনাথ সেন
(ঘ) ডঃ অনিল শীল
উত্তর: (ঘ) ডঃ অনিল শীল
১.৯ ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি রচিত হয়-
(ক) ১৮৭০ খ্রিঃ
(খ) ১৮৭২ খ্রিঃ
(গ) ১৮৭৫ খ্রিঃ
(ঘ) ۱۸৭৬ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৮৭৫ খ্রিঃ
১.১০ ‘ভারত সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়-
(ক) ১৮৬৭ খ্রিঃ
(খ) ১৮৭২ খ্রিঃ
(গ) ১৮৭৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৭৬ খ্রিঃ
উত্তর: (ঘ) ১৮৭৬ খ্রিঃ
১.১১ ‘বসুবিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন-
(ক) সত্যেন্দ্রনাথ বসু
(খ) রাসবিহারী বসু
(গ) জগদীশচন্দ্র বসু
(ঘ) কাদম্বিনী বসু
উত্তর: (গ) জগদীশচন্দ্র বসু
১.১২ ভারতে ‘হাফটোন প্রিন্টিং’ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন-
(ক) পঞ্চানন কর্মকার
(খ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
(গ) চার্লস উইলকিন্স
(ঘ) সুকুমার রায়
উত্তর: (খ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
১.১৩ নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস-এর প্রথম সভাপতি ছিলেন-
(ক) মতিলাল নেহেরু
(খ) তেজবাহাদুর সাপ্রু
(গ) বল্লভভাই প্যাটেল
(ঘ) লালা লাজপত রায়
উত্তর: (ঘ) লালা লাজপত রায়
১.১৪ বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলন হয়েছিল-
(ক) মাদ্রাজে
(খ) মালাবার উপকূলে
(গ) পাঞ্জাবে
(ঘ) গুজরাটে
উত্তর: (ঘ) গুজরাটে
১.১৫ ‘দেশপ্রাণ’ নামে পরিচিত ছিলেন-
(ক) যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত
(খ) রাসবিহারী বসু
(গ) চিত্তরঞ্জন দাশ
(ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
উত্তর: (ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
১.১৬ দুকড়িবালা দেবী যুক্ত ছিলেন-
(ক) ছাত্র আন্দোলনে
(খ) নারী আন্দোলনে
(গ) বিপ্লবী আন্দোলনে
(ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনে
উত্তর: (গ) বিপ্লবী আন্দোলনে
১.১৭ কনকলতা বড়ুয়া শহীদ হন-
(ক) অসহযোগ আন্দোলনে
(খ) আইন-অমান্য আন্দোলনে
(গ) বিপ্লবী আন্দোলনে
(ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনে
উত্তর: (ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনে
১.১৮ দলিতদের ‘হরিজন’ আখ্যা দিয়েছিলেন-
(ক) জ্যোতিবা ফুলে
(খ) নারায়ন গুরু
(গ) ডঃ আম্বেদকর
(ঘ) গান্ধিজি
উত্তর: (ঘ) গান্ধিজি
১.১৯ ভারতীয় সেনাবাহিনী গোয়া দখল করেন-
(ক) ۱۹৪৮ খ্রিঃ
(খ) ۱۹৫৪ খ্রিঃ
(গ) ۱۹৬১ খ্রিঃ
(ঘ) ۱۹৭১ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৯৬১ খ্রিঃ
১.২০ হরি সিং রাজা ছিলেন-
(ক) জয়পুর রাজ্যের
(খ) কাশ্মীর রাজ্যের
(গ) পাতিয়ালা রাজ্যের
(ঘ) জুনাগড় রাজ্যের
উত্তর: (খ) কাশ্মীর রাজ্যের
বিভাগ ‘খ’
২. যে কোনো ষোলোটি প্রশ্নের উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তঃত একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে): ১৬ × ১ = ১৬
উপবিভাগ: ২.১ — একটি বাক্যে উত্তর দাও
(২.১.১) ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?
উত্তর: ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
(২.১.২) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কত খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন?
উত্তর: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন।
(২.১.৩) ‘মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ কবে শুরু হয়?
উত্তর: ‘মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়।
(২.১.৪) ‘মতুয়া’ ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
উত্তর: ‘মতুয়া’ ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর।
উপবিভাগ: ২.২ — ঠিক না ভুল নির্ণয় করো
(২.২.১) বিপিনচন্দ্র পালের জীবনী মূলক গ্রন্থের নাম ‘সত্তর বৎসর’।
উত্তর: ঠিক।
(২.২.২) প্রথম ভারতীয় শব ব্যবচ্ছেদকারী হলেন মধুসূদন দত্ত।
উত্তর: ভুল। (সঠিক উত্তরটি হবে পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত)।
(২.২.৩) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন ব্যঙ্গ চিত্রশিল্পী।
উত্তর: ঠিক।
(২.২.৪) জাতীয় শিক্ষা-পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে।
উত্তর: ঠিক।
উপবিভাগ: ২.৩
প্রশ্ন: ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও: ১ × ৪ = ৪
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
|---|---|
| (২.৩.১) বল্লভভাই প্যাটেল | (1) হায়দ্রাবাদ |
| (২.৩.২) ডঃ বি. আর. আম্বেদকর | (2) ছাত্র আন্দোলন |
| (২.৩.৩) রশিদ আলি | (3) দলিত আন্দোলন |
| (২.৩.৪) মেজর জেনারেল জয়ন্তনাথ চৌধুরী | (4) বারদৌলি আন্দোলন |
উত্তর:
(২.৩.১) বল্লভভাই প্যাটেল — (4) বারদৌলি আন্দোলন
(২.৩.২) ডঃ বি. আর. আম্বেদকর — (3) দলিত আন্দোলন
(২.৩.৩) রশিদ আলি — (2) ছাত্র আন্দোলন
(২.৩.৪) মেজর জেনারেল জয়ন্তনাথ চৌধুরী — (1) হায়দ্রাবাদ
উপবিভাগ: ২.৫
প্রশ্ন (২.৫.১):
বিবৃতি: এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে স্যার চার্লস উডের শিক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশনামাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাখ্যা ১: তিনি ছিলেন কাউন্সিল অব এডুকেশনের সভাপতি।
ব্যাখ্যা ২: তিনি ছিলেন কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি।
ব্যাখ্যা ৩: তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের শিক্ষামন্ত্রী।
উত্তর: সঠিক ব্যাখ্যা ২: তিনি ছিলেন কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি।
প্রশ্ন (২.৫.২):
বিবৃতি: ভারতের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন প্রবর্তন করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ১: এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল অরণ্যবাসীদের মঙ্গল সাধন করা।
ব্যাখ্যা ২: এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা।
ব্যাখ্যা ৩: এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থচরিতার্থ করা।
উত্তর: সঠিক ব্যাখ্যা ৩: এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থচরিতার্থ করা।
প্রশ্ন (২.৫.৩):
বিবৃতি: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন এদেশে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ।
ব্যাখ্যা ১: তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা।
ব্যাখ্যা ২: তিনি ছিলেন বিজ্ঞান বিষয়ে নোবেল পুরস্কারজয়ী প্রথম ভারতীয়।
ব্যাখ্যা ৩: তিনি ছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস-এর প্রতিষ্ঠাতা।
উত্তর: সঠিক ব্যাখ্যা ৩: তিনি ছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস-এর প্রতিষ্ঠাতা।
প্রশ্ন (২.৫.৪):
বিবৃতি: মোপলা বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে।
ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল শিল্প শ্রমিকের বিদ্রোহ।
ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ।
ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল একটি উপজাতীয় বিদ্রোহ।
উত্তর: সঠিক ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ।
বিভাগ ‘গ’
৩. দু’টি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (যে কোনো ১১টি): ২ × ১১ = ২২
৩.১ আধুনিক ভারত ইতিহাসের উপাদানেরূপে সরকারী নথিপত্রের সীমাবদ্ধতাগুলি কী?
উত্তর: আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সরকারি নথিপত্রের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, এগুলি মূলত ব্রিটিশ শাসকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত, তাই এতে প্রায়শই পক্ষপাতিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এই নথিপত্রগুলিতে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ, জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং গণআন্দোলনের প্রকৃত চিত্রটি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত বা ব্রিটিশদের স্বার্থে বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
৩.২ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই বছর প্রবল গণ-আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ করতে বাধ্য হয় এবং ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হয়। এছাড়া, এই বছরেই মোহনবাগান ক্লাব ব্রিটিশ দল ‘ইস্ট ইয়র্কশায়ার’-কে হারিয়ে আই.এফ.এ (IFA) শিল্ড জয় করে, যা পরাধীন ভারতীয়দের মনে গভীর আত্মবিশ্বাস ও তীব্র জাতীয়তাবোধের সঞ্চার করেছিল।
৩.৩ এদেশে শিক্ষা বিস্তারে খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: উনিশ শতকে ভারতে খ্রিষ্টান মিশনারিদের শিক্ষা বিস্তারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের আড়ালে এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। পাশাপাশি, ভারতীয়দের ধর্মান্তরিত করে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অন্ধ অনুগত একটি শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি করাও তাদের অন্যতম প্রচ্ছন্ন লক্ষ্য ছিল।
৩.৪ “সর্বধর্ম সমন্বয়” বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ বলতে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব প্রচারিত এমন এক উদার ধর্মীয় আদর্শকে বোঝায়, যেখানে বলা হয়েছে পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই হলো ঈশ্বরলাভের এক-একটি ভিন্ন পথ। তাঁর বিখ্যাত উক্তি “যতো মত, ততো পথ”-এর মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মূল লক্ষ্য ও সত্য একই, তাই কোনো ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ না রেখে সব ধর্মকেই সমান শ্রদ্ধা করা উচিত।
৩.৫ “বিপ্লব” বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘বিপ্লব’ (Revolution) বলতে কোনো দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্রুত, আকস্মিক ও আমূল পরিবর্তনকে বোঝায়। যখন সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষ দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে পুরনো ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান ঘটিয়ে এক নতুন যুগান্তকারী ব্যবস্থা গড়ে তোলে, তখন তাকে বিপ্লব বলা হয়; যেমন—ফরাসি বিপ্লব বা রুশ বিপ্লব।
৩.৬ ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হল কেন?
উত্তর: দুদু মিঞা ও নোয়া মিঞার মৃত্যুর পর যোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অভাবে ফরাজি আন্দোলন ক্রমশ দুর্বল ও দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। এছাড়া, ব্রিটিশ সরকার ও স্থানীয় জমিদারদের চরম দমননীতি এবং আন্দোলনটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে ও একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার ফলেই এই কৃষক আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
৩.৭ ‘হিন্দুমেলা’ প্রতিষ্ঠার দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
উত্তর: ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে নবগোপাল মিত্র প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দুমেলা’-র প্রধান দুটি উদ্দেশ্য ছিল: প্রথমত, শিক্ষিত বাঙালি যুবসমাজের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করা এবং প্রাচীন ভারতের গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা। দ্বিতীয়ত, দেশীয় শিল্প, সাহিত্য, কুটিরশিল্পের প্রসার ঘটানো এবং শরীরচর্চার মাধ্যমে ভারতীয়দের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা।
৩.৮ জাতীয়তাবাদের উন্মেষে ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাসের কীরূপ ভূমিকা ছিল?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসটি পরাধীন ভারতের যুবসমাজে চরম দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল। এই উপন্যাসের অন্তর্নিহিত ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি বিপ্লবীদের কাছে জাতীয় মন্ত্রে পরিণত হয় এবং জন্মভূমিকে ‘মা’-রূপে বন্দনা করার যে আদর্শ তিনি তুলে ধরেন, তা সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হাসিমুখে আত্মবলিদানে অনুপ্রাণিত করেছিল।
৩.৯ পঞ্চানন কর্মকার কে ছিলেন?
উত্তর: পঞ্চানন কর্মকার ছিলেন আঠারো শতকের বাংলার একজন স্বনামধন্য স্বর্ণশিল্পী এবং মুদ্রণশিল্পের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ইংরেজ আধিকারিক চার্লস উইলকিন্স-এর সহযোগিতায় প্রথম বাংলা চলনশীল মুদ্রাক্ষর বা ‘ছাঁদ’ (Movable Type) তৈরি করেন, যার ফলে বাংলায় বই ছাপানোর কাজ সহজলভ্য হয় এবং তাঁকে ‘বাংলা মুদ্রণশিল্পের জনক’ বলা হয়।
৩.১০ বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, ব্রিটিশদের দাসত্বমূলক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ১৯০৬ সালে তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (BTI) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি যুবকদের দেশীয় প্রযুক্তিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা, যাতে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল হতে পারে।
৩.১১ স্বদেশি আন্দোলনে বাংলার কৃষকরা কেন যোগ দেয়নি?
উত্তর: স্বদেশি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ মূলত শহুরে, উচ্চবিত্ত ও জমিদার শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তাঁরা কৃষকদের খাজনা হ্রাস বা মহাজনি শোষণের মতো বাস্তব সমস্যাগুলি নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করেননি। উপরন্তু, আন্দোলনের সময় ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি বা শিবাজি উৎসবের মতো হিন্দু ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহার বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম কৃষকদের মনে সংশয় তৈরি করেছিল, ফলে তাঁরা এই আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।
৩.১২ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি কেন গঠিত হয়?
উত্তর: ১৯২৫-১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতের কমিউনিস্টদের উদ্যোগে শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকার রক্ষার স্বার্থে ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি’ গঠিত হয়। এই দল গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—শ্রমিকদের কাজের সময় কমানো, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, জমিদার ও পুঁজিপতিদের শোষণের অবসান ঘটানো এবং জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী আদর্শের প্রসার ঘটিয়ে পূর্ণ স্বরাজ অর্জনের পথ প্রশস্ত করা।
৩.১৩ ‘কার্লাইল সার্কুলার’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে বাংলার ছাত্রসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত ও বিপুল অংশগ্রহণ বন্ধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের মুখ্যসচিব আর. ডব্লিউ. কার্লাইল একটি দমনমূলক নির্দেশিকা জারি করেন, যা ‘কার্লাইল সার্কুলার’ (২২ অক্টোবর, ১৯০৫) নামে পরিচিত। এই সার্কুলারে বলা হয়, কোনো স্কুলের ছাত্ররা আন্দোলনে যোগ দিলে বা ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দিলে সেই স্কুল বা কলেজের সরকারি অনুদান, স্বীকৃতি ও ছাত্রদের বৃত্তি তৎক্ষণাৎ বাতিল করা হবে।
৩.১৪ ‘দলিত’ কাদের বলা হয়?
উত্তর: ‘দলিত’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো অবদমিত বা শোষিত। প্রাচীন হিন্দু বর্ণব্যবস্থায় সমাজের একেবারে নীচের স্তরে থাকা যেসকল প্রান্তিক ও অস্পৃশ্য সম্প্রদায় (যেমন- মাহার, চামার, নমঃশূদ্র প্রভৃতি) যুগ যুগ ধরে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ও শোষিত হয়ে এসেছে, আধুনিক ভারতের ইতিহাসে তাদেরকেই ‘দলিত’ বলা হয়।
৩.১৫ ‘ভারতভুক্তির দলিল’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘ভারতভুক্তির দলিল’ (Instrument of Accession) হলো ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রণীত এমন একটি আইনি চুক্তিপত্র, যার মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যগুলির রাজারা স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানে যোগদানের বিষয়ে নিজেদের আনুষ্ঠানিক সম্মতি জ্ঞাপন করতেন। এই দলিলে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যগুলি তাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ভারত সরকারের হাতে তুলে দিত।
৩.১৬ ‘রাজ্যপুনর্গঠন কমিশন’ (১৯৫৩) কেন গঠিত হয়?
উত্তর: স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে পৃথক রাজ্যের দাবিতে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়, যার চরম পরিণতি ছিল ১৯৫২ সালে পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের উদ্ভব। এই পরিস্থিতিতে সমগ্র ভারতের রাজ্যগুলির সীমানা বিজ্ঞানসম্মতভাবে, মূলত ভাষার ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় ভারত সরকার ১৯৫৩ সালে ফজল আলির নেতৃত্বে ‘রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’ গঠন করে।
