মাধ্যমিক ২০২৫ — ইতিহাস সমাধান (সম্পূর্ণ)
বিষয়: ইতিহাস (History)
পরীক্ষা: মাধ্যমিক ২০২৫ (WBBSE)
তারিখ: ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
সময়: ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট
পূর্ণমান: ৯০ (নিয়মিত পরীক্ষার্থী) / ১০০ (বহিরাগত পরীক্ষার্থী)
বিভাগ ‘ক’ — সঠিক উত্তর নির্বাচন (১ × ২০ = ২০)
১.১ ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’ রচনা করেন —
(ক) সরলা দেবী চৌধুরানী (খ) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ঘ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উত্তর: (ঘ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১.২ ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন —
(ক) লীলা নাগ (খ) কল্পনা দত্ত (গ) বাসন্তী দেবী (ঘ) লীলাবতী মিত্র
উত্তর: (ক) লীলা নাগ
১.৩ সূর্য সেন শহীদ হন —
(ক) ১৯৩০ খ্রিঃ (খ) ১৯৩২ খ্রিঃ (গ) ১৯৩৩ খ্রিঃ (ঘ) ১৯৩৪ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৯৩৪ খ্রিঃ
১.৪ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাস করে —
(ক) ৪ঠা জুন, ১৯৪৬ খ্রিঃ (খ) ১৮ই জুলাই, ১৯৪৭ খ্রিঃ (গ) ১৪ই আগস্ট, ১৯৪৭ খ্রিঃ (ঘ) ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭ খ্রিঃ
উত্তর: (খ) ১৮ই জুলাই, ১৯৪৭ খ্রিঃ
১.৫ রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের (১৯৫৩) সভাপতি ছিলেন —
(ক) এস. কে. দার (খ) বল্লভভাই প্যাটেল (গ) ভি. পি. মেনন (ঘ) ফজল আলি
উত্তর: (ক) এস. কে. দার (ফজল আলি ছিলেন রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের (১৯৫৩) সভাপতি)
দ্রষ্টব্য: ১৯৫৩ সালে গঠিত রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের সভাপতি ছিলেন ফজল আলি। তবে, ১৯৪৮ সালে গঠিত ‘দার কমিশন’-এর সভাপতি ছিলেন এস. কে. দার। প্রশ্নে ১৯৫৩ সালের উল্লেখ থাকায় সঠিক উত্তর (ঘ) ফজল আলি।
১.৬ হ্যালহেড রচিত ‘এ গ্রামার অফ দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ বইটি ছাপা হয়েছিল —
(ক) কলকাতায় (খ) শ্রীরামপুরে (গ) হুগলিতে (ঘ) ঢাকায়
উত্তর: (গ) হুগলিতে
১.৭ মাসিক ‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় —
(ক) ১৮৯৬ খ্রিঃ (খ) ১৯০৪ খ্রিঃ (গ) ১৯০৭ খ্রিঃ (ঘ) ১৯১৩ খ্রিঃ
উত্তর: (ঘ) ১৯১৩ খ্রিঃ
১.৮ ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ গঠন করেছিলেন —
(ক) বাবা রামচন্দ্র (খ) স্বামী সহজানন্দ (গ) মৌলানা ভাসানী (ঘ) ফজলুল হক
উত্তর: (ঘ) ফজলুল হক
১.৯ স্বামী বিদ্যানন্দ বিহারে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন —
(ক) স্বদেশি আন্দোলনে (খ) অসহযোগ আন্দোলনে (গ) আইন-অমান্য আন্দোলনে (ঘ) ভারত-ছাড়ো আন্দোলনে
উত্তর: (খ) অসহযোগ আন্দোলনে
১.১০ বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন —
(ক) লালা লাজপত রায় (খ) অশ্বিনীকুমার দত্ত (গ) অশ্বিনীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (ঘ) অরবিন্দ ঘোষ
উত্তর: (গ) অশ্বিনীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
১.১১ কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-১৮৩২) দমনে কোম্পানির সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেন —
(ক) ক্যাপ্টেন রজার্স (খ) ক্যাপ্টেন স্কট (গ) ক্যাপ্টেন উইলকিনসন (ঘ) মেজর উইলিয়ামস্
উত্তর: (গ) ক্যাপ্টেন উইলকিনসন
১.১২ ‘বাংলার নানাসাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন —
(ক) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (খ) কাদের মোল্লা (গ) রেভাঃ জেমস লঙ্ (ঘ) রামরতন মল্লিক
উত্তর: (ঘ) রামরতন মল্লিক
১.১৩ ঔপনিবেশিক ভারতের প্রথম ‘রাজপ্রতিনিধি’ ছিলেন —
(ক) ওয়ারেন হেস্টিংস (খ) লর্ড বেন্টিঙ্ক (গ) লর্ড ক্যানিং (ঘ) লর্ড মাউন্টব্যাটেন
উত্তর: (গ) লর্ড ক্যানিং
১.১৪ বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভার কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন —
(ক) রামমোহন রায় (খ) রাজা রাধাকান্ত দেব (গ) কালীনাথ রায়চৌধুরী (ঘ) মদনমোহন তর্কালঙ্কার
উত্তর: (গ) কালীনাথ রায়চৌধুরী
১.১৫ ‘বিরূপবজ্র’ গ্রন্থটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন —
(ক) গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (গ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (ঘ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
উত্তর: (ঘ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
১.১৬ প্রথম বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রটি হল —
(ক) সম্বাদ ভাস্কর (খ) সংবাদ কৌমুদি (গ) সংবাদ প্রভাকর (ঘ) সমাচার দর্পণ
উত্তর: (গ) সংবাদ প্রভাকর
১.১৭ ‘বঙ্গদর্শন’ প্রথম প্রকাশিত হয় —
(ক) ১৭৮০ খ্রিঃ (খ) ১৮১৫ খ্রিঃ (গ) ১৮৬৩ খ্রিঃ (ঘ) ১৮৭২ খ্রিঃ
উত্তর: (ঘ) ১৮৭২ খ্রিঃ
১.১৮ হিন্দু মেট্রোপলিটান কলেজ (১৮৫৩ খ্রিঃ) প্রতিষ্ঠা করেন —
(ক) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) রাধাকান্ত দেব (গ) বিদ্যাসাগর (ঘ) মতিলাল শীল
উত্তর: (গ) বিদ্যাসাগর
১.১৯ কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন —
(ক) দ্বারকানাথ ঠাকুর (খ) বৈষ্ণবচরণ শেঠ (গ) ডেভিড হেয়ার (ঘ) মতিলাল শীল
উত্তর: (ঘ) মতিলাল শীল
১.২০ ‘দ্য রিফর্মার’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন —
(ক) রামমোহন রায় (খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (গ) কেশবচন্দ্র সেন (ঘ) প্রসন্ন কুমার ঠাকুর
উত্তর: (ঘ) প্রসন্ন কুমার ঠাকুর
বিভাগ ‘খ’ — সংক্ষিপ্ত উত্তর (১ × ১৬ = ১৬)
উপবিভাগ ২.১ — একটি বাক্যে উত্তর দাও (১ × ৪ = ৪)
(২.১.১) একটি ‘স্থানীয় ইতিহাস’ গ্রন্থের নাম লেখো।
উত্তর: একটি উল্লেখযোগ্য স্থানীয় ইতিহাস গ্রন্থ হল রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘বাংলার ইতিহাস’।
(২.১.২) কোন্ বছর ভারতে প্রথম রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা শুরু হয়?
উত্তর: ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রথম রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা শুরু হয় (বোম্বাই থেকে থানে)।
(২.১.৩) কোন্ বছর কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ (University College of Science) প্রতিষ্ঠিত হয়।
(২.১.৪) কোন্ বিদ্রোহে সুই মুণ্ডা নেতৃত্ব দেন?
উত্তর: কোল বিদ্রোহে (১৮৩১-১৮৩২) সুই মুণ্ডা নেতৃত্ব দেন।
উপবিভাগ ২.২ — ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও (১ × ৪ = ৪)
প্রশ্ন:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
|---|---|
| (২.২.১) রেভাঃ কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় | (১) কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল |
| (২.২.২) বিদ্যাসাগর | (২) ভারতসভা |
| (২.২.৩) মিনু মাসানি | (৩) বিপ্লবী কার্যকলাপ |
| (২.২.৪) কল্পনা দত্ত | (৪) নারী শিক্ষা |
উত্তর:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
|---|---|
| (২.২.১) রেভাঃ কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় | (২) ভারতসভা |
| (২.২.২) বিদ্যাসাগর | (৪) নারী শিক্ষা |
| (২.২.৩) মিনু মাসানি | (১) কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল |
| (২.২.৪) কল্পনা দত্ত | (৩) বিপ্লবী কার্যকলাপ |
উপবিভাগ ২.৩ — ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো (১ × ৪ = ৪)
(২.৩.১) স্বামী সহজানন্দ ছিলেন বারদৌলি আন্দোলনের অন্যতম নেতা।
উত্তর: ভুল। বারদৌলি আন্দোলনের (১৯২৮) নেতা ছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। স্বামী সহজানন্দ ছিলেন বিহারের কৃষক আন্দোলনের নেতা।
(২.৩.২) নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ।
উত্তর: ভুল। নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের (AITUC) প্রথম সভাপতি ছিলেন লালা লাজপত রায় (১৯২০)।
(২.৩.৩) কৃষ্ণকুমার মিত্র ছিলেন অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির সভাপতি।
উত্তর: ভুল। অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির সভাপতি ছিলেন শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু।
(২.৩.৪) অল ইন্ডিয়া সিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন বি. আর. আম্বেদকর।
উত্তর: ঠিক। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে বি. আর. আম্বেদকর অল ইন্ডিয়া সিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
উপবিভাগ ২.৪ — মানচিত্র চিহ্নিতকরণ (১ × ৪ = ৪)
(২.৪.১) কোল বিদ্রোহের (১৮৩১-১৮৩২) এলাকা — ছোটনাগপুর (রাঁচি, সিংভূম অঞ্চল)
(২.৪.২) সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫-১৮৫৬) এলাকা — রাজমহল পাহাড় অঞ্চল (বর্তমান ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগনা)
(২.৪.৩) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) একটি কেন্দ্র — লক্ষ্ণৌ (অযোধ্যা অঞ্চল, উত্তরপ্রদেশ)
(২.৪.৪) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) একটি কেন্দ্র — ঝাঁসি (মধ্যভারত, বর্তমান উত্তরপ্রদেশ)
উপবিভাগ ২.৫ — বিবৃতি-ব্যাখ্যা নির্বাচন (১ × ৪ = ৪)
(২.৫.১) বিবৃতি: ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ ছিল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা।
ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল, হিন্দু বিপ্লবীদের একটি মুখপত্র।
ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল, নব্য হিন্দু আন্দোলনের একটি মুখপত্র।
ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল, একটি স্বাধীন, সাহসী ও প্রগতিশীল সংবাদপত্র।
উত্তর: সঠিক ব্যাখ্যা ৩ — এটি ছিল, একটি স্বাধীন, সাহসী ও প্রগতিশীল সংবাদপত্র।
(২.৫.২) বিবৃতি: উনিশ শতকের বাংলায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল নব্যবঙ্গ দলের আবির্ভাব।
ব্যাখ্যা ১: উনিশ শতকের বাংলায় ইংরেজি শিক্ষিত ছাত্ররা নব্যবঙ্গ নামে পরিচিত ছিল।
ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল, ডিরোজিও কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কলকাতার তরুন ছাত্রদের একটি দল।
ব্যাখ্যা ৩: হিন্দু কলেজের শিক্ষক ডিরোজিও-র ছাত্রগণ যৌথভাবে ‘নব্যবঙ্গ’ নামে পরিচিত ছিল।
উত্তর: সঠিক ব্যাখ্যা ৩ — হিন্দু কলেজের শিক্ষক ডিরোজিও-র ছাত্রগণ যৌথভাবে ‘নব্যবঙ্গ’ নামে পরিচিত ছিল।
(২.৫.৩) বিবৃতি: উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার প্রকাশকগণ তাদের পুস্তক বিক্রয়ের জন্য ফেরিওয়ালাদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন।
ব্যাখ্যা ১: ঐ সময়ে পুস্তক ব্যবসাকে সম্মানীয় পেশারূপে গণ্য করা হত না।
ব্যাখ্যা ২: ঐ সময়ে বইয়ের দোকানের সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত।
ব্যাখ্যা ৩: ঐ সময়ে ফেরিওয়ালাদের মাধ্যমে অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে বই পৌঁছানো ছিল সহজ এবং সুলভ।
উত্তর: সঠিক ব্যাখ্যা ৩ — ঐ সময়ে ফেরিওয়ালাদের মাধ্যমে অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে বই পৌঁছানো ছিল সহজ এবং সুলভ।
(২.৫.৪) বিবৃতি: ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারী মাসে জুনাগড় রাজ্যটি ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ব্যাখ্যা ১: জুনাগড় রাজ্যটির শাসক ভারতীয় ইউনিয়নে স্বেচ্ছায় যোগদান করেন।
ব্যাখ্যা ২: ভারতীয় সেনাবাহিনী জুনাগড় রাজ্যটি আক্রমণ ও দখল করে।
ব্যাখ্যা ৩: জুনাগড় রাজ্যটির জনগণ গণভোটের মাধ্যমে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
উত্তর: সঠিক ব্যাখ্যা ৩ — জুনাগড় রাজ্যটির জনগণ গণভোটের মাধ্যমে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
বিভাগ ‘গ’ — সংক্ষিপ্ত উত্তর (২ × ১১ = ২২)
(যে কোনো ১১টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
৩.১ ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৮ই ডিসেম্বর বিপ্লবী বীণা দাস, কমলা দাশগুপ্ত ও অন্যান্য বিপ্লবী বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যা করার চেষ্টা করেন — তবে প্রকৃত ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ বলতে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৮ই ডিসেম্বর রাইটার্স বিল্ডিং-এ বিপ্লবী বিনয়-বাদল-দীনেশ-এর সশস্ত্র আক্রমণকে বোঝায়। এই তিন বিপ্লবী — বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত — কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এর অলিন্দে (বারান্দা/করিডোর) প্রবেশ করে কারা-ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এন. এস. সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। এই ঘটনাটিই ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
৩.২ কী উদ্দেশ্যে ‘নারী কর্মমন্দির’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর: উর্মিলা দেবী ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ‘নারী কর্মমন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটানো। এই প্রতিষ্ঠান নারীদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিত এবং স্বদেশি আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করত।
৩.৩ শেখ আবদুল্লা কে ছিলেন?
উত্তর: শেখ মহম্মদ আবদুল্লা ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, যিনি ‘কাশ্মীরের শের’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রতিষ্ঠাতা এবং স্বাধীনতার পরে কাশ্মীরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী (১৯৪৮) নিযুক্ত হন। কাশ্মীরের ভারতভুক্তিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
৩.৪ ‘দার কমিশন’ (১৯৪৮) কেন গঠিত হয়েছিল?
উত্তর: ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি বিচার করার জন্য ভারত সরকার ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে বিচারপতি এস. কে. দার-এর নেতৃত্বে ‘দার কমিশন’ গঠন করে। এই কমিশনের কাজ ছিল ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ পুনর্গঠন সম্ভব ও যুক্তিযুক্ত কিনা তা পরীক্ষা করা। দার কমিশন তাদের রিপোর্টে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের বিরোধিতা করেছিল।
৩.৫ বাংলা ছাপাখানার বিকাশে সুরেশচন্দ্র মজুমদার-এর অবদান কী ছিল?
উত্তর: সুরেশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন উনিশ শতকে বাংলা ছাপাখানার বিকাশে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলা হাফটোন ব্লক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর চেষ্টায় বাংলায় মুদ্রণশিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু হয় এবং চিত্রসহ বাংলা বই ও পত্রিকা ছাপানো সম্ভব হয়ে ওঠে।
৩.৬ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী উদ্দেশ্যে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয় সাধন করা এবং প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশে শিক্ষাদানের মাধ্যমে ছাত্রদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁর মূলমন্ত্র ছিল — ‘যত্র বিশ্বম্ ভবত্যেক নীড়ম্’ অর্থাৎ যেখানে সমগ্র বিশ্ব একটি নীড়ে পরিণত হবে।
৩.৭ বাংলায় কৃষক আন্দোলনে বীরেন্দ্রনাথ শাসমল কীরূপ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর: বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ছিলেন বাংলার কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। তিনি মেদিনীপুর জেলায় কৃষকদের সংগঠিত করে খাজনা বন্ধ আন্দোলন (অসহযোগ আন্দোলনের সময়, ১৯২১-১৯২২) পরিচালনা করেন। ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারমূলক রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করায় তাঁর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
৩.৮ ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’টি কী?
উত্তর: ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার ভারতে কমিউনিস্ট ও শ্রমিক আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে যে বিখ্যাত মামলা দায়ের করে, তাই ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত। এই মামলায় মুজাফ্ফর আহমদ, এস. এ. ডাঙ্গে, ফিলিপ স্প্র্যাট প্রমুখ ৩৩ জন শ্রমিক-কৃষক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতে ক্রমবর্ধমান কমিউনিস্ট ও শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করা।
৩.৯ বারাসাত বিদ্রোহ ব্যর্থ হ’ল কেন?
উত্তর: ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে তিতুমীরের নেতৃত্বে বারাসাত বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল — (ক) বিদ্রোহীদের কাছে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ছিল না, তারা বাঁশের কেল্লায় লাঠিসোটা নিয়ে লড়াই করেছিল; (খ) ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উন্নত কামান ও বন্দুকের সামনে বাঁশের কেল্লা টিকতে পারেনি; এবং (গ) স্থানীয় জমিদার ও নীলকরদের সক্রিয় বিরোধিতা বিদ্রোহকে দুর্বল করে দেয়।
৩.১০ সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫-১৮৫৬) গুরুত্ব কী?
উত্তর: সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম উপজাতি বিদ্রোহ। এর গুরুত্ব হল — (ক) এটি ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করে সাঁওতাল পরগনা নামে একটি পৃথক জেলা গঠন করতে; (খ) মহাজনী শোষণ ও জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক-আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে; এবং (গ) পরবর্তী আদিবাসী আন্দোলনগুলিকে অনুপ্রাণিত করে।
৩.১১ ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুর ও প্রসন্ন কুমার ঠাকুরের উদ্যোগে ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জমিদার শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করা এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছে জমিদারদের সমস্যা ও দাবি-দাওয়া তুলে ধরা। এটি ছিল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন।
৩.১২ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরণীয় কেন?
উত্তর: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন উনিশ শতকের ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতসভা (Indian Association) প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল ভারতের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব এবং ‘রাষ্ট্রগুরু’ উপাধি তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
৩.১৩ মানুষের খাদ্যাভাসের উপর ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাব কতটা?
উত্তর: মানুষের খাদ্যাভাসের উপর ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। যেমন — উপকূলবর্তী অঞ্চলে মৎস্যজীবীদের প্রধান খাদ্য মাছ, পার্বত্য অঞ্চলে যব ও ভুট্টার চাষ হওয়ায় সেখানকার মানুষের খাদ্যতালিকায় এগুলো প্রাধান্য পায়, আবার সমতলভূমিতে ধান-গমের চাষ হওয়ায় ভাত-রুটি প্রধান খাদ্য। এভাবে ভৌগোলিক পরিবেশ মানুষের খাদ্যাভাসকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
৩.১৪ আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদানরূপে বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘সত্তর-বৎসর’ এর গুরুত্ব কী?
উত্তর: বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী ‘সত্তর বৎসর’ আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার একটি অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান। এই গ্রন্থে ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের প্রথমভাগের বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রত্যক্ষ বিবরণ পাওয়া যায়। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ এই গ্রন্থটিকে ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে বিশেষ মূল্যবান করে তুলেছে।
৩.১৫ হরিনাথ মজুমদার স্মরণীয় কেন?
উত্তর: হরিনাথ মজুমদার (কাঙাল হরিনাথ) ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সমাজসেবক। তিনি ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার সম্পাদনা করে নীলকর ও জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন। গ্রামীণ কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ করে তিনি সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৩.১৬ লর্ড হার্ডিঞ্জ এর শিক্ষানীতির (১৮৪৪) গুরুত্ব কী?
উত্তর: লর্ড হার্ডিঞ্জের শিক্ষানীতি (১৮৪৪) ভারতে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নীতি অনুসারে সরকারি চাকরিতে ইংরেজি শিক্ষিতদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা করা হয়। ফলে ভারতীয়দের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার আগ্রহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করে।
বিভাগ ‘ঘ’ — বিশ্লেষণধর্মী উত্তর (৪ × ৬ = ২৪)
(প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্ততঃ ১টি করে, মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
উপবিভাগ: ঘ.১
৪.১ দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির বিষয়ে সর্দার প্যাটেলের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় প্রায় ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য ছিল। এই রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করা ছিল একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ।
প্যাটেলের ভূমিকা:
– সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাজ্য দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
– তিনি কূটনৈতিক দক্ষতা, আলোচনা ও প্রয়োজনে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বেশিরভাগ দেশীয় রাজ্যকে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন’ স্বাক্ষরে রাজি করান।
– জুনাগড়, হায়দরাবাদ ও কাশ্মীরের মতো সমস্যাপূর্ণ রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ় পদক্ষেপ নেন — জুনাগড়ে গণভোট, হায়দরাবাদে সামরিক অভিযান (‘অপারেশন পোলো’) পরিচালনা করেন।
– তাঁর সচিব ভি. পি. মেনন তাঁকে এই কাজে সর্বাত্মক সহায়তা করেন।
মূল্যায়ন: প্যাটেলের অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতা ও দৃঢ় সংকল্পের ফলে ভারত একটি অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম হয়। এই কারণে তাঁকে ‘ভারতের লৌহমানব’ ও ‘ভারতের বিসমার্ক’ বলা হয়।
৪.২ ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কারণ কী?
ভূমিকা: স্বাধীনতার পর ভারতে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি জোরদার হয়ে ওঠে।
প্রয়োজনীয়তার কারণ:
– প্রশাসনিক সুবিধা: একই ভাষাভাষী মানুষ একটি রাজ্যে থাকলে প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা সহজ হয় এবং সরকারি নথি, আদেশ ও আইনকানুন জনগণের নিজের ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হয়।
– জাতীয় ঐক্য রক্ষা: ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবি পূরণ না হলে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভের সম্ভাবনা ছিল, যা জাতীয় ঐক্যকে বিপন্ন করতে পারত (যেমন, পট্টি শ্রীরামালু-র অনশন)।
– সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা: প্রতিটি ভাষাগোষ্ঠীর নিজস্ব সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্য ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন প্রয়োজন ছিল।
– গণতান্ত্রিক অধিকার: গণতন্ত্রে জনগণের নিজের ভাষায় শাসনে অংশগ্রহণের অধিকার মৌলিক বিষয়।
উপসংহার: ১৯৫৩ সালে ফজল আলি কমিশন (রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন) এবং ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন আইনের মাধ্যমে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন বাস্তবায়িত হয়।
উপবিভাগ: ঘ.২
৪.৩ বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে শ্রীরামপুর মিশনারীদের অবদান বিশ্লেষণ করো।
ভূমিকা: বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন বা শ্রীরামপুর মিশনারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড ছিলেন এই মিশনের তিন প্রধান ব্যক্তিত্ব।
অবদান:
– মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা বাংলায় মুদ্রণশিল্পের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
– বাংলা টাইপ নির্মাণ: চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকার প্রথম বাংলা অক্ষরের ধাতব টাইপ (মুদ্রাক্ষর) নির্মাণ করেন, যা শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে ব্যবহৃত হয়।
– গ্রন্থ ও পত্রিকা প্রকাশ: মিশন থেকে বাংলা ভাষায় বাইবেল অনুবাদ ছাড়াও বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হয়। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ‘সমাচার দর্পণ’ (বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র) ও ‘দিগদর্শন’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
– বহুভাষিক মুদ্রণ: এই প্রেস থেকে বাংলা ছাড়াও সংস্কৃত, হিন্দি, মারাঠি-সহ বিভিন্ন ভাষায় গ্রন্থ মুদ্রিত হয়।
উপসংহার: শ্রীরামপুর মিশনারীরা বাংলায় আধুনিক মুদ্রণশিল্পের ভিত্তি স্থাপন করে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও শিক্ষার বিকাশে যুগান্তকারী অবদান রাখেন।
৪.৪ বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশে ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ – এর অবদান বিশ্লেষণ করো।
ভূমিকা: বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার বিকাশে ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ (IACS) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
অবদান:
– প্রতিষ্ঠা: ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার কলকাতায় এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এটি ছিল ভারতীয়দের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
– উদ্দেশ্য: ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটানো, মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ তৈরি করা এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।
– গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা: এই প্রতিষ্ঠানেই বিজ্ঞানী সি. ভি. রমন তাঁর বিখ্যাত ‘রমন ইফেক্ট’ আবিষ্কার করেন (১৯২৮), যার জন্য তিনি ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
– বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার: নিয়মিত বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা, প্রদর্শনী ও গবেষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
উপসংহার: IACS ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি মাইলফলক এবং আত্মনির্ভর বৈজ্ঞানিক গবেষণার পথপ্রদর্শক প্রতিষ্ঠান।
উপবিভাগ: ঘ.৩
৪.৫ মুণ্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০) গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো।
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ছোটনাগপুর অঞ্চলে মুণ্ডা জনজাতির নেতা বিরসা মুণ্ডা-র নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, তাকেই মুণ্ডা বিদ্রোহ বা ‘উলগুলান’ (মহাবিদ্রোহ) বলা হয়।
গুরুত্ব:
– ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা: মুণ্ডা বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ‘ছোটনাগপুর টেনান্সি অ্যাক্ট’ (CNT Act) প্রণয়ন করতে, যা আদিবাসীদের জমি হস্তান্তর নিষিদ্ধ করে।
– ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ: বিদেশি জমিদার (‘দিকু’) ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
– ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার: বিরসা মুণ্ডা শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি মুণ্ডা সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলনও পরিচালনা করেন। তাঁকে মুণ্ডারা ‘ধরতি আবা’ (পৃথিবীর পিতা) বলে সম্মান করত।
– জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ: এই বিদ্রোহ ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে আদিবাসী অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
উপসংহার: মুণ্ডা বিদ্রোহ ভারতের আদিবাসী আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা এবং বিরসা মুণ্ডা আজও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন মহান নায়ক হিসেবে সমাদৃত।
৪.৬ নীল বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালী সমাজের ভূমিকা কীরূপ ছিল?
ভূমিকা: ১৮৫৯-১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকরা যে বিদ্রোহ করে, সেই নীল বিদ্রোহে শিক্ষিত বাঙালি সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষিত বাঙালি সমাজের ভূমিকা:
– সংবাদপত্রের ভূমিকা: হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকায় নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনি প্রকাশিত হয়ে জনমত গড়ে তোলে। শিশিরকুমার ঘোষের ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়।
– সাহিত্যে প্রতিফলন: দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) নাটকে নীলকরদের শোষণের জীবন্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।
– ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নীলচাষিদের পক্ষে সক্রিয় সমর্থন জানান।
– আইনি সহায়তা: শিক্ষিত বাঙালি আইনজীবীরা নীলচাষিদের হয়ে আদালতে মামলা পরিচালনা করেন।
উপসংহার: শিক্ষিত বাঙালি সমাজের সক্রিয় সমর্থনের ফলে সরকার ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ‘নীল কমিশন’ গঠন করতে বাধ্য হয় এবং নীলচাষ ক্রমশ বিলুপ্ত হয়।
উপবিভাগ: ঘ.৪
৪.৭ সভ্যতার বিকাশের ইতিহাসে ‘যানবাহন-যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাস’ এর গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো।
ভূমিকা: মানবসভ্যতার বিকাশে যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সভ্যতার অগ্রগতির মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়।
গুরুত্ব:
– বাণিজ্য ও অর্থনীতি: উন্নত যানবাহন ব্যবস্থা দূরদূরান্তে পণ্য পরিবহন সম্ভব করে বাণিজ্যের প্রসার ঘটায়। নদীপথে, সমুদ্রপথে ও স্থলপথে যোগাযোগ বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করেছে।
– সাংস্কৃতিক বিনিময়: যানবাহন ব্যবস্থার উন্নতি বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান সম্ভব করেছে। সিল্ক রোড এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
– ঔপনিবেশিক শাসন ও জাতীয়তাবাদ: ভারতে রেল যোগাযোগ (১৮৫৩) ব্রিটিশ শাসনের হাতিয়ার হলেও পরোক্ষে ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য ও জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটায়।
– আধুনিক সভ্যতা: বাষ্পীয় ইঞ্জিন, রেলপথ, মোটরগাড়ি, বিমান — প্রতিটি আবিষ্কার সভ্যতার ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করেছে।
উপসংহার: যানবাহন-যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাস কেবল প্রযুক্তিগত উন্নতির নয়, বরং মানবসভ্যতার সামগ্রিক বিকাশের ইতিহাস।
৪.৮ সংবাদপত্ররূপে ‘সোমপ্রকাশ’ – এর গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো।
ভূমিকা: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সোমপ্রকাশ’ ছিল বাংলা ভাষায় প্রথম রাজনৈতিক সংবাদপত্র।
গুরুত্ব:
– রাজনৈতিক চেতনা প্রসার: ‘সোমপ্রকাশ’ ছিল প্রথম বাংলা পত্রিকা যা সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের নীতি ও কার্যকলাপের সমালোচনা করত। এটি জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
– কৃষক স্বার্থ রক্ষা: এই পত্রিকায় নীলচাষিদের দুর্দশা, চা-বাগান শ্রমিকদের অত্যাচার এবং কৃষকদের উপর জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে সরব হয়।
– সমাজ সংস্কার: বিধবা বিবাহ সমর্থন, স্ত্রীশিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ বিরোধিতা ইত্যাদি সমাজ সংস্কারমূলক বিষয়ে ‘সোমপ্রকাশ’ জোরালো অবস্থান গ্রহণ করে।
– সরকারি দমনের প্রতিবাদ: ব্রিটিশ সরকার ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ‘ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট’ জারি করলে ‘সোমপ্রকাশ’ প্রথম এর প্রতিবাদ করে এবং প্রকাশনা বন্ধ রাখে।
উপসংহার: ‘সোমপ্রকাশ’ ঔপনিবেশিক বাংলায় জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।
বিভাগ ‘ঙ’ — রচনাধর্মী উত্তর (৮ × ১ = ৮)
(যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
৫.১ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর ভূমিকা বিশ্লেষণ করো। বিংশ শতকের ভারতে নারী আন্দোলনে দীপালি সংঘের কিরূপ ভূমিকা ছিল? (৩ + ৫ = ৮)
প্রথম অংশ: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ভূমিকা (৩ নম্বর)
ভূমিকা: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের একজন অগ্রণী নারী বিপ্লবী, যাঁর আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
বিপ্লবী জীবন:
– প্রীতিলতা চট্টগ্রামের মেয়ে এবং মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সদস্যা ছিলেন।
– ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর তিনি সূর্য সেনের বিপ্লবী দলে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন।
– ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দেন। এই ক্লাবের সামনে লেখা ছিল — “Dogs and Indians not allowed” (কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ)।
– আক্রমণ শেষে ধরা পড়ার আগেই তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। তিনিই ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গকারী প্রথম নারী শহীদ।
দ্বিতীয় অংশ: দীপালি সংঘের ভূমিকা (৫ নম্বর)
ভূমিকা: বিংশ শতকের ভারতে নারী আন্দোলনের ইতিহাসে দীপালি সংঘ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন।
প্রতিষ্ঠা ও পটভূমি:
– ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় লীলা নাগ (পরবর্তীতে লীলা রায়) দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন।
– এটি ছিল ঢাকায় স্থাপিত ‘দীপালি সঙ্ঘ’-এর কলকাতা শাখা, যার আগে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
নারী আন্দোলনে ভূমিকা:
– নারী শিক্ষার প্রসার: দীপালি সংঘ নারী শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। লীলা নাগ ঢাকায় বেশ কয়েকটি নারী বিদ্যালয় ও অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
– সামাজিক সংস্কার: নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য দীপালি সংঘ বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। সেলাই, বুনন, হস্তশিল্প ইত্যাদি শেখানো হত।
– রাজনৈতিক সচেতনতা: আইন অমান্য আন্দোলনে (১৯৩০) নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে এবং রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে নারীদের যোগদানের পথ প্রশস্ত করে।
– বিপ্লবী কার্যকলাপে সহায়তা: সংঘের কিছু সদস্যা গোপনে বিপ্লবী কার্যকলাপে জড়িত হন এবং অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, গোপন চিঠি পাঠানো ইত্যাদি কাজে সহায়তা করেন।
– সেবামূলক কাজ: বন্যা ও দুর্ভিক্ষের সময় ত্রাণ বিতরণ এবং দরিদ্র নারীদের সেবায় সংঘ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
উপসংহার: দীপালি সংঘ শুধুমাত্র একটি সামাজিক সংগঠন ছিল না, এটি বাংলায় নারী জাগরণ ও নারী ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লীলা নাগের নেতৃত্বে এই সংঘ নারীদের শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে যে অবদান রেখেছিল, তা ভারতের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
৫.২ বাংলা ছাপাখানার বিকাশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বহুবিধ কর্মপ্রচেষ্টার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। (৮)
ভূমিকা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাবিদদের অন্যতম। বাংলা ছাপাখানার বিকাশে তাঁর বহুমুখী কর্মপ্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যাসাগরের অবদান:
(ক) বাংলা গদ্যের আধুনিকীকরণ:
– বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষাকে সংস্কারমুক্ত করে আধুনিক, সহজবোধ্য ও প্রবাহমান রূপ দেন। তাঁর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’ (১৮৫৫) বাংলা ভাষা শেখার প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক হিসেবে যুগান্তকারী।
– বাংলা গদ্যে যতিচিহ্নের (কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি ইত্যাদি) প্রচলন তাঁর অন্যতম অবদান।
(খ) ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা:
– বিদ্যাসাগর নিজে ‘সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি’ নামে একটি ছাপাখানা ও বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন।
– এই প্রেস থেকে তাঁর নিজের রচিত ও সম্পাদিত অসংখ্য গ্রন্থ মুদ্রিত হয়, যা বাংলা মুদ্রণশিল্পের বিকাশে সহায়ক হয়।
(গ) বাংলা হরফের সংস্কার:
– বিদ্যাসাগর বাংলা টাইপ বা মুদ্রাক্ষরের আকৃতি সরলীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বাংলা বর্ণমালাকে আরও সুষম ও মুদ্রণবান্ধব করে তোলেন।
– তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলা হরফের যুক্তাক্ষর ও জটিল বর্ণসমূহকে সরলতর রূপ দেওয়া হয়।
(ঘ) পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশনা:
– তিনি বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন — ‘বর্ণপরিচয়’, ‘কথামালা’, ‘বোধোদয়’, ‘আখ্যানমঞ্জরী’ ইত্যাদি।
– সংস্কৃত ক্লাসিক থেকে বাংলায় অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন (যেমন — ‘শকুন্তলা’, ‘সীতার বনবাস’)।
– এই পাঠ্যপুস্তকগুলি ব্যাপকভাবে মুদ্রিত ও বিতরিত হয়, যা বাংলা ছাপাখানা শিল্পকে সমৃদ্ধ করে।
(ঙ) মুদ্রণশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা:
– বিদ্যাসাগর বিভিন্ন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং নতুন মুদ্রণযন্ত্র আমদানিতে উৎসাহ দেন।
উপসংহার: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মুদ্রণশিল্পের ইতিহাসে একজন যুগপুরুষ। তাঁর বহুমুখী কর্মপ্রচেষ্টা বাংলা ছাপাখানার বিকাশে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে এবং আধুনিক বাংলা ভাষার গদ্যরূপ নির্মাণে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
৫.৩ সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের (১৭৬৩-১৮০০) সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। এই বিদ্রোহের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী ছিল? (৫ + ৩ = ৮)
প্রথম অংশ: সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ (৫ নম্বর)
ভূমিকা: সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে বাংলায় সংঘটিত প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ আন্দোলন, যা প্রায় ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
পটভূমি ও কারণ:
– পলাশির যুদ্ধের (১৭৫৭) পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
– কোম্পানির অত্যধিক রাজস্ব আদায়, বাণিজ্যিক একচেটিয়া নীতি এবং কৃষক-সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার বিদ্রোহের প্রধান কারণ।
– সন্ন্যাসী ও ফকিরদের (হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলিম ফকির) তীর্থযাত্রায় বাধাদান ও কর আরোপ তাঁদের ক্ষুব্ধ করে।
– ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ (‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’) পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তোলে।
বিদ্রোহের বিবরণ:
– হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলিম ফকিররা একত্রিত হয়ে কোম্পানির কুঠি, রাজকোষ ও শস্যভাণ্ডার আক্রমণ করে।
– ফকির মজনু শাহ ছিলেন ফকির বিদ্রোহের প্রধান নেতা। তিনি ১৭৭১ থেকে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা ও বিহারে কোম্পানির বিরুদ্ধে একাধিক আক্রমণ পরিচালনা করেন।
– সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অন্যতম নেতা ছিলেন ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী।
– বিদ্রোহীরা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে — রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া প্রভৃতি জেলায় সক্রিয় ছিলেন।
– ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সংগঠিত বাহিনীর সামনে বিদ্রোহীরা শেষপর্যন্ত পরাজিত হন।
দ্বিতীয় অংশ: ঐতিহাসিক তাৎপর্য (৩ নম্বর)
ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
– প্রথম প্রতিরোধ: সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রথম সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলনগুলির অন্যতম, যা পরবর্তী বিদ্রোহগুলিকে অনুপ্রাণিত করে।
– হিন্দু-মুসলিম ঐক্য: এই বিদ্রোহে হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলিম ফকিররা একসঙ্গে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
– সাহিত্যে প্রভাব: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসে এই বিদ্রোহের পটভূমিকায় কাহিনি রচনা করেন, যেখান থেকে জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম্’ উদ্ভূত হয়।
– প্রশাসনিক সংস্কার: এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারকে বাংলায় প্রশাসনিক ও রাজস্ব ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার করতে বাধ্য করে।
উপসংহার: সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ভারতের ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রথম অধ্যায় এবং পরবর্তী সকল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণার উৎস।
বিভাগ ‘চ’ — কেবলমাত্র বহিরাগত পরীক্ষার্থীদের জন্য
৬.১ একটি পূর্ণ বাক্যে উত্তর দাও (যে কোনো ৪টি) (১ × ৪ = ৪)
(৬.১.১) ‘আত্মীয় সভা’ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
উত্তর: রাজা রামমোহন রায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন।
(৬.১.২) ‘যত মত, তত পথ’ এর আদর্শ কে প্রচার করেন?
উত্তর: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ‘যত মত, তত পথ’ এর আদর্শ প্রচার করেন।
(৬.১.৩) তিতুমীরের প্রকৃত নাম কী?
উত্তর: তিতুমীরের প্রকৃত নাম ছিল মীর নিসার আলি।
(৬.১.৪) ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি কে রচনা করেন?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি রচনা করেন।
(৬.১.৫) শান্তিনিকেতন, কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম (পরবর্তীতে বিশ্বভারতী) প্রতিষ্ঠা করেন।
(৬.১.৬) ‘সর্দার’ উপাধিতে কে ভূষিত হন?
উত্তর: বারদৌলি সত্যাগ্রহে (১৯২৮) সাফল্যের পর বল্লভভাই প্যাটেল ‘সর্দার’ উপাধিতে ভূষিত হন।
৬.২ দু’টি অথবা তিনটি বাক্যে উত্তর দাও (যে কোনো তিনটি) (২ × ৩ = ৬)
(৬.২.১) পরিবেশের ইতিহাস বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: পরিবেশের ইতিহাস বলতে বোঝায় মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক বিবর্তনের অধ্যয়ন। এতে ভৌগোলিক পরিবেশ কীভাবে মানবসভ্যতার বিকাশকে প্রভাবিত করেছে এবং মানুষের কার্যকলাপ কীভাবে প্রকৃতিকে পরিবর্তিত করেছে — সেই বিষয়গুলি আলোচিত হয়। পরিবেশ দূষণ, বনধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় পরিবেশের ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত।
(৬.২.২) ‘বিপ্লব’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘বিপ্লব’ বলতে সমাজ, রাষ্ট্র বা অর্থনৈতিক কাঠামোয় আমূল ও দ্রুত পরিবর্তনকে বোঝায়। রাজনৈতিক বিপ্লব (যেমন ফরাসি বিপ্লব, ১৭৮৯) বলতে পুরাতন শাসনব্যবস্থার উৎখাত ও নতুন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাকে বোঝায়। শিল্প বিপ্লবের মতো অর্থনৈতিক বিপ্লবও সমাজে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।
(৬.২.৩) সাঁওতাল বিদ্রোহের দু’জন নেতার নাম লেখ।
উত্তর: সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫-১৮৫৬) দু’জন প্রধান নেতা ছিলেন — (১) সিধু ও (২) কানু। তাঁরা দু’জনেই ছিলেন মুর্মু গোষ্ঠীর সাঁওতাল এবং বিদ্রোহের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দেন।
(৬.২.৪) ‘রসিদ আলি দিবস’ কেন পালিত হয়েছিল?
উত্তর: ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রসিদ আলি-কে ব্রিটিশ সরকার বিচারে সাজা দিলে তাঁর মুক্তির দাবিতে কলকাতায় ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়। এই দিনটি ‘রসিদ আলি দিবস’ নামে পরিচিত, যা ব্রিটিশ বিরোধী জনরোষের প্রকাশ ছিল।
(৬.২.৫) কী উদ্দেশ্যে ‘শ্রীনিকেতন’ গড়ে ওঠে?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে বোলপুরের নিকটে ‘শ্রীনিকেতন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ পুনর্গঠন — অর্থাৎ গ্রামের কৃষক ও কারিগরদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, গ্রামীণ শিল্পের বিকাশ এবং গ্রামবাসীদের স্বনির্ভর করে তোলা।
