2023 মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমাধান

মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্র সমাধান ২০২৩

(Madhyamik History Question Paper Solution 2023)

বিভাগ ‘ক’

১। সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো:

১.১ র‍্যাচেল কারসন যুক্ত ছিলেন-
(ক) আঞ্চলিক ইতিহাসে
(খ) নারীর ইতিহাসে
(গ) পরিবেশের ইতিহাসে
(ঘ) শহরের ইতিহাসে
উত্তর: (গ) পরিবেশের ইতিহাসে

১.২ বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন
(ক) তিন বছর
(খ) চার বছর
(গ) দশ বছর
(ঘ) বারো বছর
উত্তর: (খ) চার বছর

১.৩ রামমোহন রায় অ্যাংলো হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
(ক) ১৮২১ খ্রিঃ
(খ) ১৮২৩ খ্রিঃ
(গ) ১৮১৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮২৬ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৮১৫ খ্রিঃ

১.৪ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তিপ্রাপক ছিলেন
(ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(খ) বিদ্যাসাগর
(গ) আনন্দমোহন বসু
(ঘ) আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (ঘ) আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

১.৫ ‘রেনেসাঁস’ শব্দটি হল, একটি
(ক) ইংরেজি শব্দ
(খ) ফরাসি শব্দ
(গ) ইতালিয় শব্দ
(ঘ) ল্যাটিন শব্দ
উত্তর: (খ) ফরাসি শব্দ

১.৬ ‘জঙ্গলমহল’ নামে একটি পৃথক জেলা গঠন করা হয়েছিল
(ক) সাঁওতাল বিদ্রোহের পরে
(খ) কোল বিদ্রোহের পরে
(গ) চুয়াড় বিদ্রোহের পরে
(ঘ) মুন্ডা বিদ্রোহের পরে
উত্তর: (গ) চুয়াড় বিদ্রোহের পরে

১.৭ ভারতের রাজকীয় বনবিভাগের প্রথম ইন্সপেক্টর জেনারেল ছিলেন
(ক) জোহান ক্রুগার
(খ) এলিয়াস ফিসার
(গ) ডিয়েট্রিস ব্রান্ডিস
(ঘ) ফ্রেডারিক হফম্যান
উত্তর: (গ) ডিয়েট্রিস ব্রান্ডিস

১.৮ মহাবিদ্রোহকে (১৮৫৭) যে ব্রিটিশ লেখক ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন
(ক) চার্লস রেইকস্
(খ) নর্টন
(গ) ম্যালেসন
(ঘ) ডিজরেলি
উত্তর: (ক) চার্লস রেইকস্

১.৯ চৈত্রমেলা, ‘হিন্দুমেলা’ রূপে পরিচিত হয়
(ক) ১৮৬৭ খ্রিঃ থেকে
(খ) ১৮৭০ খ্রিঃ থেকে
(গ) ১৮৭২ খ্রিঃ থেকে
(ঘ) ১৮৭৫ খ্রিঃ থেকে
উত্তর: (গ) ১৮৭২ খ্রিঃ থেকে

১.১০ ভারতসভার প্রথম সভাপতি ছিলেন
(ক) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
(খ) আনন্দমোহন বসু
(গ) রেভাঃ কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
(ঘ) শিবনাথ শাস্ত্রী
উত্তর: (গ) রেভাঃ কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

১.১১ বাংলা পুস্তক ব্যবসায়ের পথিকৃৎ ছিলেন
(ক) উইলিয়াম কেরি
(খ) রামমোহন রায়
(গ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
(ঘ) গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য
উত্তর: (ঘ) গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য

১.১২ বাংলা লাইনোটাইপ প্রবর্তিত হয়
(ক) ১৭৭৮ খ্রিঃ
(খ) ১৮৭৮ খ্রিঃ
(গ) ১৯২৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৯৩৫ খ্রিঃ
উত্তর: (ঘ) ১৯৩৫ খ্রিঃ

১.১৩ ‘দেশপ্রাণ’ নামে পরিচিত ছিলেন
(ক) অশ্বিনীকুমার দত্ত
(খ) সতীশচন্দ্র সামন্ত
(গ) যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত
(ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
উত্তর: (ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল

১.১৪ ভারতের প্রথম শ্রমিক সংগঠন ছিল
(ক) গিরনি কামগার ইউনিয়ন
(খ) মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন
(গ) ইন্ডিয়ান মিলহ্যান্ডস্ ইউনিয়ন
(ঘ) সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস
উত্তর: (খ) মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন

১.১৫ কৃষক প্রজাপার্টি প্রতিষ্ঠা করেন
(ক) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
(খ) প্রফুল্লচন্দ্র সেন
(গ) বাবা রামচন্দ্র
(ঘ) ফজলুল হক
উত্তর: (ঘ) ফজলুল হক

১.১৬ ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’ রচনা করেন
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) রজনীকান্ত সেন
(ঘ) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
উত্তর: (ঘ) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

১.১৭ নারী কর্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
(ক) উর্মিলা দেবী
(খ) বাসন্তী দেবী
(গ) সরলা দেবী চৌধুরানি
(ঘ) সুনীতি দেবী
উত্তর: (ক) উর্মিলা দেবী

১.১৮ এজাভা সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা ছিলেন
(ক) রামস্বামী নাইকার
(খ) ত্যাগরাজা চেট্টি
(গ) নারায়ন গুরু
(ঘ) ভীমরাও আম্বেদকর
উত্তর: (গ) নারায়ন গুরু

১.১৯ ভাষাভিত্তিক পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যটি গঠিত হয়েছিল
(ক) ১৯৪৭ খ্রিঃ
(খ) ১৯৫০ খ্রিঃ
(গ) ১৯৫৩ খ্রিঃ
(ঘ) ১৯৫৬ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৯৫৩ খ্রিঃ

১.২০ পুরুলিয়া জেলাটি পশ্চিমবঙ্গর অন্তর্ভুক্ত হয়
(ক) ১৯৫০ খ্রিঃ
(খ) ১৯৫২ খ্রিঃ
(গ) ১৯৫৬ খ্রিঃ
(ঘ) ১৯৬০ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৯৫৬ খ্রিঃ


বিভাগ ‘খ’

২। যে কোনো ষোলোটি প্রশ্নের উত্তর দাও:

উপবিভাগ: ২.১ – একটি বাক্যে উত্তর দাও:

(২.১.১) ভারতের কোন বছর রেলপথ প্রবর্তিত হয়?
উত্তর: ভারতে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে রেলপথ প্রবর্তিত হয়।

(২.১.২) গ্রামবার্তা প্রকাশিকা কোথা থেকে প্রকাশিত হত?
উত্তর: ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি গ্রাম থেকে প্রকাশিত হত।

(২.১.৩) বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট-এর প্রথম অধ্যক্ষ কে ছিলেন?
উত্তর: বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI)-এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন প্রমথনাথ বসু

(২.১.৪) ‘গান্ধিবুড়ি’ নামে কে পরিচিত ছিলেন?
উত্তর: ‘গান্ধিবুড়ি’ নামে মাতঙ্গিনী হাজরা পরিচিত ছিলেন।

উপবিভাগ: ২.২ – ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো:

(২.২.১) বিপিনচন্দ্র পালের জীবনী গ্রন্থের নাম ‘সত্তর বৎসর’।
উত্তর: ঠিক

(২.২.২) প্রথম ভারতীয় শবব্যবচ্ছেদকারী ছিলেন মধুসূদন দত্ত।
উত্তর: ভুল (সঠিক উত্তর: মধুসূদন গুপ্ত)

(২.২.৩) ড. অনিল শীল আঠারো শতককে ‘সভাসমিতির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন।
উত্তর: ভুল (সঠিক উত্তর: উনিশ শতককে)

(২.২.৪) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন ব্যঙ্গচিত্র শিল্পী। (প্রশ্নে গেণন্দ্রনাথ আছে, কিন্তু এটি গগনেন্দ্রনাথ হবে)
উত্তর: ঠিক

উপবিভাগ: ২.৩ – ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও:

‘ক’ স্তম্ভ‘খ’ স্তম্ভ
(২.৩.১) সি. ভি. রমণ(৩) কলকাতা
(২.৩.২) বাবা রামচন্দ্র(৪) উত্তরপ্রদেশ
(২.৩.৩) উষা বেন মেহতা(২) বোম্বাই
(২.৩.৪) হেমু কালানি(১) সিন্ধুপ্রদেশ

উপবিভাগ: ২.৪ – ম্যাপ পয়েন্টিং (প্রদত্ত মানচিত্রে স্থানগুলি চিহ্নিত করতে হবে):

(২.৪.১) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) একটি কেন্দ্র – মীরাট। (মানচিত্রে চিহ্নিত করতে হবে)
(২.৪.২) সাঁওতাল বিদ্রোহের এলাকা (দামিন-ই-কোহ)। (মানচিত্রে চিহ্নিত করতে হবে)
(২.৪.৩) বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের একটি কেন্দ্র – বারাসাত। (মানচিত্রে চিহ্নিত করতে হবে)
(২.৪.৪) দেশীয় রাজ্য হায়দ্রাবাদ। (মানচিত্রে চিহ্নিত করতে হবে)

অথবা (কেবলমাত্র দৃষ্টিহীন পরীক্ষার্থীদের জন্য) – শূন্যস্থান পূরণ করো:

(২.৪.১) ‘মাস্টারদা’ নামে পরিচিত ছিলেন সূর্য সেন
(২.৪.২) ওয়াহাবি বলতে বোঝায় নবজাগরণ
(২.৪.৩) ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থটির লেখক ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ
(২.৪.৪) হরি সিং ছিলেন কাশ্মীর এর রাজা।

উপবিভাগ: ২.৫ – নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:

(২.৫.১) বিবৃতি: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্ম সমাজে যোগদান করেন এবং এটি ব্রাহ্ম আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
ব্যাখ্যা ১: তিনি সমগ্র ভারতবর্ষে ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ২: তিনি খ্রিস্টধর্ম প্রচারকদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাফল্যজনকভাবে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ৩: তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সংস্কার করেন এবং নতুন প্রাণসঞ্চার করেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সংস্কার করেন এবং নতুন প্রাণসঞ্চার করেন।

(২.৫.২) বিবৃতি: ভারতের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন প্রবর্তন করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ১: ব্রিটিশ সরকারের অরণ্য আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা।
ব্যাখ্যা ২: ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল অরণ্যবাসীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা।
ব্যাখ্যা ৩: ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থে অরণ্য সম্পদ ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থে অরণ্য সম্পদ ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

(২.৫.৩) বিবৃতি: গান্ধিজি কখনো শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে চাননি।
ব্যাখ্যা ১: গান্ধিজি ছিলেন মিল-মালিক শ্রেণির প্রতিনিধি।
ব্যাখ্যা ২: গান্ধিজি পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে চেয়েছিলেন।
ব্যাখ্যা ৩: গান্ধিজি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: গান্ধিজি পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে চেয়েছিলেন।

(২.৫.৪) বিবৃতি: ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মোপলা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল কৃষকদের একটি জঙ্গী আন্দোলন।
ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল একটি উপজাতীয় বিদ্রোহ।
ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল শিল্প-শ্রমিকদের একটি অভ্যুত্থান।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল কৃষকদের একটি জঙ্গী আন্দোলন।


বিভাগ ‘গ’

৩। দু’টি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (যে কোনো এগারোটি):

৩.১ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে দুটি প্রধান কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই বছর প্রবল গণ-আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয়ত, এই বছরেই ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হয়।

৩.২ ‘সরকারি নথিপত্র’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘সরকারি নথিপত্র’ বলতে ব্রিটিশ শাসনকালে বিভিন্ন সরকারি আমলা, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের লেখা রিপোর্ট, সরকারি নির্দেশিকা, চিঠিপত্র এবং প্রশাসনিক দলিলদস্তাবেজকে বোঝায়। আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এগুলি অত্যন্ত প্রামাণ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

৩.৩ কাদম্বিনী (বসু) গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণীয়া কেন?
উত্তর: কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণীয় কারণ তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা স্নাতক এবং ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসকদের অন্যতম। এছাড়া তিনি নারীশিক্ষা প্রসার এবং জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে (১৮৮৯) প্রথম মহিলা প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে নারী জাগরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

৩.৪ কোম্পানির শিক্ষাক্ষেত্রে ‘চুঁইয়ে পড়া নীতি’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ব্রিটিশ শিক্ষাসচিব মেকলে বিশ্বাস করতেন যে, ভারতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটলে তা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, ঠিক যেমন জল ওপর থেকে নিচে চুঁইয়ে পড়ে। মেকলের এই নীতিই ‘নিম্নমুখী পরিস্রুত নীতি’ বা ‘চুঁইয়ে পড়া নীতি’ (Downward Filtration Theory) নামে পরিচিত।

৩.৫ দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সী কেন গড়ে তোলা হয়েছিল?
উত্তর: ১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দে কোল বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার জন্য উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলকে সাধারণ আইন থেকে আলাদা করে। কোলদের শান্ত রাখতে এবং বিদ্রোহ দমন করে সেখানে ব্রিটিশ শাসন সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে ছোটোনাগপুর অঞ্চল নিয়ে ‘দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি’ (South-West Frontier Agency) গঠন করা হয়।

৩.৬ ফরাজি আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ কী?
উত্তর: ফরাজি আন্দোলনের ব্যর্থতার প্রধান কারণ ছিল সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব। দুদু মিঞার মৃত্যুর পর এই আন্দোলন যোগ্য নেতার অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আন্দোলনটি মূলত ধর্মীয় ও স্থানীয় স্তরে সীমাবদ্ধ থাকায় তা সর্বভারতীয় রূপ নিতে পারেনি। তাছাড়া ব্রিটিশদের নিষ্ঠুর দমননীতিও এর পতনের কারণ।

৩.৭ মহারানির ঘোষনাপত্রের (১৮৫৮) প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের মহারানির ঘোষণাপত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রশমিত করে ব্রিটিশ শাসনকে সুদৃঢ় করা। ভারতীয়দের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা এবং দেশীয় রাজ্যগুলিকে আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতীয়দের আনুগত্য আদায় করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

৩.৮ জমিদার সভা ও ভারতসভার মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর:
১. সদস্য প্রকৃতি: জমিদার সভা ছিল মূলত উচ্চবিত্ত জমিদার ও ধনী শ্রেণির স্বার্থরক্ষার প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, ভারতসভা ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি সংগঠন।
২. উদ্দেশ্য: জমিদার সভার উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু ভারতসভার লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলা এবং সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা।

৩.৯ ড. মহেন্দ্রলাল সরকার স্মরণীয় কেন?
উত্তর: ড. মহেন্দ্রলাল সরকার ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত বাঙালি চিকিৎসক ও বিজ্ঞানানুরাগী। তিনি ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে বিজ্ঞান গবেষণার প্রথম প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ (IACS) প্রতিষ্ঠা করেন, যা ভারতে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার পথ প্রশস্ত করেছিল।

৩.১০ বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশের প্রভাব কতটা?
উত্তর: বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার প্রভাব ছিল বৈপ্লবিক। ছাপাখানার ফলে প্রচুর বই ও সংবাদপত্র সুলভে মুদ্রিত হতে থাকে, যা শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে সহায়ক হয়। আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশ, রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় কুসংস্কার দূরীকরণে ছাপাখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৩.১১ আল্লুরি সীতারাম রাজু কে ছিলেন?
উত্তর: আল্লুরি সীতারাম রাজু ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন অকুতোভয় আদিবাসী নেতা। তিনি ১৯২২-২৪ খ্রিস্টাব্দে অন্ধ্রপ্রদেশের গোদাবরী উপত্যকায় রম্পা উপজাতিদের ব্রিটিশদের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে বিখ্যাত ‘রম্পা বিদ্রোহ’ পরিচালনা করেছিলেন।

৩.১২ ‘মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা’টি কী?
উত্তর: ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতে সাম্যবাদী ও শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার মুজফফর আহমেদ, এস এ ডাঙ্গে সহ ৩৩ জন কমিউনিস্ট নেতার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। এটি ‘মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত, যার লক্ষ্য ছিল বামপন্থী আন্দোলনকে ধ্বংস করা।

৩.১৩ দীপালি সংঘ কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী লীলা নাগ (রায়) ঢাকায় দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীদের মধ্যে শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা, লাঠিখেলা ও অস্ত্রচালনা শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তোলা এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মহিলাদের যুক্ত করা।

৩.১৪ গুরুচাঁদ ঠাকুর স্মরণীয় কেন?
উত্তর: গুরুচাঁদ ঠাকুর ছিলেন নমশূদ্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা। তিনি নিম্নবর্ণের হিন্দু ও নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের জন্য এবং তাদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তারে আজীবন কাজ করেছেন, যে কারণে তিনি স্মরণীয়।

৩.১৫ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলির স্বাধীনতার দাবিকে অগ্রাহ্য করেছিলেন কেন?
উত্তর: ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশীয় রাজ্যগুলি স্বাধীন থাকতে চাইলে ভারতের ঐক্য ও অখণ্ডতা চরম সংকটে পড়ত। একটি খণ্ডিত ভারতের দুর্বলতা দূর করতে এবং ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ঐক্য সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই সর্দার প্যাটেল রাজ্যগুলির স্বাধীনতার দাবি অগ্রাহ্য করে তাদের ভারতভুক্তিতে বাধ্য করেন।

৩.১৬ রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) কেন গঠিত হয়েছিল?
উত্তর: স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের জোরালো দাবি ওঠে। এই দাবির যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখতে এবং প্রশাসনিক সুবিধার্থে রাজ্যগুলির সীমানা কীভাবে নির্ধারণ করা যায়, তা বিচার করার জন্যই ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ফজল আলির নেতৃত্বে ‘রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’ গঠিত হয়।


বিভাগ ‘ঘ’

৪। সাত বা আটটি বাক্যে যে কোনো ছ’টি প্রশ্নের উত্তর দাও:

উপবিভাগ: ঘ.১

৪.১ উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে রামমোহন রায়ের ভূমিকার মূল্যায়ন করো।
উত্তর:
উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।
* শিক্ষার মাধ্যম: তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ভারতীয়দের প্রকৃত উন্নতির জন্য সংস্কৃত বা ফারসির বদলে আধুনিক ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজন। ১৮২৩ সালে তিনি লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লিখে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের জোর দাবি জানান।
* প্রতিষ্ঠান স্থাপন: ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্রিয় সহযোগিতা করেন। ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিজ ব্যয়ে অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল স্থাপন করেন।
* বেদান্ত কলেজ: ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ভারতীয় দর্শনের পাশাপাশি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান পড়ানো হতো।
* মূল্যায়ন: রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই ব্রিটিশ সরকার ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষায় জোর দেয়। তাঁর হাত ধরেই বাংলায় আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।

৪.২ ধর্মসংস্কার আন্দোলনরূপে ব্রাহ্ম আন্দোলনের মূল্যায়ন করো।
উত্তর:
উনিশ শতকের সমাজ ও ধর্মসংস্কারের ইতিহাসে ব্রাহ্ম আন্দোলন ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
* একেশ্বরবাদ প্রচার: রাজা রামমোহন রায় হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতা ও বহুদেবতাবাদের বিরোধিতা করে বেদান্তের ওপর ভিত্তি করে নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা প্রবর্তন করেন, যা পরে ব্রাহ্ম সমাজ নামে পরিচিত হয়।
* কুসংস্কার দূরীকরণ: ব্রাহ্ম সমাজ হিন্দুধর্মের জাতপাত, সতীদাহ প্রথা, অস্পৃশ্যতা এবং অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে এই আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।
* সামাজিক প্রভাব: ধর্মসংস্কারের পাশাপাশি এটি ছিল একটি সামাজিক আন্দোলন যা নারী স্বাধীনতা, বিধবাবিবাহ এবং অসবর্ণ বিবাহকে উৎসাহ দিয়েছিল।
* মূল্যায়ন: যদিও এই আন্দোলন মূলত শিক্ষিত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং গ্রামীণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি, তা সত্ত্বেও হিন্দুধর্মের রক্ষণশীলতাকে ভেঙে আধুনিক ও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনে ব্রাহ্ম আন্দোলনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

উপবিভাগ: ঘ.২

৪.৩ ‘বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব’ এর ধারণাটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
ইতিহাসের পাতায় প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ বোঝাতে বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়।
* বিদ্রোহ (Rebellion): প্রচলিত শাসক বা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের প্রকাশ্য ও সশস্ত্র প্রতিবাদ হলো বিদ্রোহ। এটি সাধারণত স্থানীয় বা আঞ্চলিক স্তরে ঘটে এবং এর লক্ষ্য থাকে সাময়িক কোনো অন্যায়ের প্রতিকার। যেমন— সাঁওতাল বিদ্রোহ বা কোল বিদ্রোহ।
* অভ্যুত্থান (Uprising/Revolt): অভ্যুত্থান হলো বিদ্রোহের চেয়ে বৃহত্তর এবং বেশি সংগঠিত। যখন কোনো দেশের সেনাবাহিনী বা জনগণের বৃহৎ অংশ একযোগে শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আন্দোলন করে, তখন তাকে অভ্যুত্থান বলে। যেমন— নৌবিদ্রোহ (১৯৪৬) বা সিপাহি অভ্যুত্থান।
* বিপ্লব (Revolution): বিপ্লব বলতে বোঝায় একটি দীর্ঘস্থায়ী, সর্বাত্মক এবং আমূল পরিবর্তন। এর মাধ্যমে কোনো দেশের প্রচলিত আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা হয়। যেমন— ফরাসি বিপ্লব বা রুশ বিপ্লব।

৪.৪ বারাসাত বিদ্রোহের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে তিতুমিরের নেতৃত্বে অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার বারাসাত অঞ্চলে যে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা বারাসাত বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এর প্রকৃতি ছিল বহুমুখী:
* ধর্মীয় সংস্কার: প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ছিল একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন। তিতুমির ওয়াহাবি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্মের শুদ্ধিকরণের ডাক দিয়েছিলেন।
* কৃষক বিদ্রোহ: পরবর্তীকালে এটি কৃষক বিদ্রোহের রূপ নেয়। হিন্দু জমিদার, নীলকর সাহেব এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের অতিরিক্ত কর ও শোষণের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।
* শ্রেণি সংগ্রাম: এই আন্দোলনে কৃষকরা তাদের শোষক জমিদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তাই অনেকে একে আংশিক শ্রেণি সংগ্রাম বলেও মনে করেন।
* জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ: তিতুমির ইংরেজদের শাসন অস্বীকার করে নিজেকে স্বাধীন রাজা ঘোষণা করেছিলেন, যা ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি প্রাথমিক রূপ।

উপবিভাগ: ঘ.৩

৪.৫ বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভূমিকার মূল্যায়ন করো।
উত্তর:
বাংলায় ছাপাখানার প্রযুক্তিগত বিকাশ ও বই প্রকাশনার ক্ষেত্রে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।
* ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স: ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স’ (U. Ray and Sons) নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যা সেযুগের অন্যতম সেরা ছাপাখানায় পরিণত হয়।
* হাফটোন ব্লকের উদ্ভাবন: তিনি ভারতে প্রথম উন্নত মানের ছবি ছাপার জন্য হাফটোন ব্লক তৈরি করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এর ফলে বইয়ের মধ্যে সুন্দর ও স্পষ্ট ছবি ছাপা সম্ভব হয়।
* প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: তিনি ডায়ালটাইপ, স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার প্রভৃতি যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন করে মুদ্রণশিল্পে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। বিলেতের বিখ্যাত পত্রিকা ‘পেনরোজ অ্যানুয়াল’-এ তাঁর লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।
* শিশুসাহিত্য মুদ্রণ: তাঁর ছাপাখানা থেকে ‘ছেলেদের রামায়ণ’, ‘টুনটুনির বই’, এবং ‘সন্দেশ’ পত্রিকা অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নিখুঁতভাবে মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হতো। বাংলার মুদ্রণশিল্পকে বিশ্বমানে পৌঁছে দেওয়ায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

৪.৬ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাভাবনার সমালোচনামূলক আলোচনা করো।
উত্তর:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রিটিশদের প্রবর্তিত প্রথাগত কেরানি তৈরির শিক্ষার ঘোর বিরোধী।
* প্রকৃতি ও মানুষের সমন্বয়: তাঁর মতে, শিক্ষাকে হতে হবে প্রকৃতির কোল ঘেঁষে। চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ শিক্ষা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করে। তাই তিনি শান্তিনিকেতনে মুক্ত আকাশের নিচে আশ্রমিক শিক্ষার প্রবর্তন করেন।
* সৃজনশীলতার বিকাশ: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শুধু পুঁথিগত বিদ্যাই যথেষ্ট নয়। শিল্প, সংগীত, নৃত্য ও হাতের কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও আত্মপ্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।
* মাতৃভাষায় শিক্ষাদান: তিনি শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, কারণ মাতৃভাষাতেই শিক্ষা সবচেয়ে সহজে আত্মস্থ করা সম্ভব।
* সমালোচনা: তাঁর শিক্ষাদর্শন অত্যন্ত আদর্শবাদী হলেও তা সকলের জন্য সহজলভ্য ছিল কাশী। গ্রামীণ শান্তিনিকেতনের এই মডেল আধুনিক শিল্পনির্ভর ও কারিগরি যুগে কতটা কর্মমুখী বা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে অনেক শিক্ষাবিদ সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবুও আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে তাঁর মুক্ত শিক্ষার ধারণা আজও প্রাসঙ্গিক।

উপবিভাগ: ঘ.৪

৪.৭ স্বাধীনতা লাভের পর ভারতীয় রাজ্যগুলিকে ভাষার ভিত্তিতে পুনর্গঠনের জন্য কী কী প্রচেষ্টা হয়েছিল?
উত্তর:
স্বাধীনতা লাভের পর ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি তীব্র আকার ধারণ করে, যার জন্য বেশ কিছু প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল:
* দার কমিশন (১৯৪৮): ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের দাবি খতিয়ে দেখতে সরকার এস. কে. দারের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। তবে এই কমিশন ভাষার পরিবর্তে প্রশাসনিক সুবিধার ওপর জোর দেয়।
* জে. ভি. পি. কমিটি (১৯৪৮): জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল এবং পট্টভি সীতারামাইয়ার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিও ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের দাবিকে সাময়িকভাবে প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দেয়।
* অন্ধ্রপ্রদেশ গঠন (১৯৫৩): মাদ্রাজে তেলুগুভাষীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবিতে পত্তি শ্রীরামালুর অনশন ও মৃত্যুর (১৯৫২) ফলে ব্যাপক দাঙ্গা শুরু হয়। বাধ্য হয়ে সরকার ১৯৫৩ সালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য ‘অন্ধ্রপ্রদেশ’ গঠন করে।
* রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩): অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের পর অন্যান্য ভাষার মানুষেরাও সরব হলে ১৯৫৩ সালে ফজল আলির নেতৃত্বে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯৫৬ সালে ‘রাজ্য পুনর্গঠন আইন’ পাস হয় এবং ১৪টি রাজ্য ও ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরি হয়।

৪.৮ কীভাবে কাশ্মীর সমস্যার সৃষ্টি হয়?
উত্তর:
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় কাশ্মীর ছিল একটি দেশীয় রাজ্য, যার শাসক ছিলেন হিন্দু রাজা হরি সিং, কিন্তু বেশিরভাগ প্রজা ছিলেন মুসলিম।
* স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা: ভারত বিভাজনের সময় রাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রেই যোগ না দিয়ে কাশ্মীরকে স্বাধীন রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
* পাক আক্রমণ: কিন্তু ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সশস্ত্র উপজাতীয় হানাদার বাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করে এবং ব্যাপক লুঠতরাজ চালায়।
* ভারতভুক্তি: উপায়ন্তর না দেখে রাজা হরি সিং শর্তসাপেক্ষে ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চান এবং ১৯৪ ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর ‘ভারতভুক্তির দলিলে’ (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন।
* সংঘর্ষ ও জাতিপুঞ্জ: ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে হানাদারদের বিতাড়িত করতে শুরু করে। কিন্তু পাকিস্তান তা মানতে অস্বীকার করে। বিষয়টি রাষ্ট্রসংঘে পৌঁছালে ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়, এবং কাশ্মীরের একাংশ পাকিস্তানের দখলে থেকে যায়। এভাবেই দীর্ঘস্থায়ী কাশ্মীর সমস্যার সূত্রপাত হয়।


বিভাগ ‘ঙ’

৫। পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:

৫.১ বাংলার নবজাগরণ বলতে কী বোঝায়? এই নবজাগরণের সীমাবদ্ধতাগুলি কী? (৩+৫=৮)
উত্তর:

ভূমিকা:
উনিশ শতকে পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী আদর্শের সংস্পর্শে এসে বাংলার সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে যে অভাবনীয় উন্নতি ও আধুনিকতার প্রসার ঘটেছিল, ঐতিহাসিকগণ তাকেই ‘বাংলার নবজাগরণ’ বা ‘বেঙ্গল রেনেসাঁস’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইতালির রেনেসাঁর অনুকরণে এই নামকরণ করা হলেও, বাংলার নবজাগরণ ছিল মূলত ঔপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি জাগরণ।

নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা:
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ সমাজের সর্বস্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি। এর বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা ছিল:

  1. শহরাকেন্দ্রিকতা: এই নবজাগরণ মূলত কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রাম-বাংলার বৃহত্তর জনসমাজ এই আধুনিক চিন্তাধারার ছোঁয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিল।
  2. উচ্চবর্ণ ও অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ: এই জাগরণ মূলত ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত মুষ্টিমেয় হিন্দু ভদ্রলোক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের (ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ) মধ্যেই আটকে ছিল। নিম্নবর্গের মানুষ, কৃষক বা শ্রমিক শ্রেণির এতে কোনো অংশগ্রহণ ছিল না।
  3. মুসলিম সমাজের অনুপস্থিতি: বাংলার নবজাগরণে হিন্দু ধর্ম ও সমাজের সংস্কার বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী বৃহৎ মুসলিম সমাজ আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় তারা এই নবজাগরণের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।
  4. ব্রিটিশ নির্ভরতা: নবজাগরণের হোতারা অনেকেই ব্রিটিশ শাসনের সুফল সম্পর্কে অতি-আস্থাশীল ছিলেন। তাঁরা মনে করতেন ইংরেজ শাসনই ভারতের উন্নতির একমাত্র পথ, ফলে প্রথমদিকে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী বা স্বাধীনতাস্পৃহার অভাব দেখা গিয়েছিল।
  5. সনাতনপন্থীদের বাধা: এই সময়কালে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মতো সমাজসংস্কারকরা সতীদাহ প্রথা রদ বা বিধবাবিবাহ প্রচলনের মতো প্রগতিশীল পদক্ষেপ নিলেও, রাধাকান্ত দেবের মতো রক্ষণশীল হিন্দু নেতারা তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, যা সংস্কারের গতিকে মন্থর করেছিল।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, বাংলার নবজাগরণ ইতালীয় নবজাগরণের মতো সর্বাত্মক ছিল না। ড. সুমিত সরকারের মতে এটি ছিল একটি “এলিটিস্ট” বা অভিজাতদের আন্দোলন। এতৎসত্ত্বেও, আধুনিক ভারতের রূপরেখা নির্মাণে এবং জাতীয়তাবাদের বিকাশে উনিশ শতকের বাংলার এই জাগরণের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় পণ্ডিতগণ।


(কেবলমাত্র বহিরাগত পরীক্ষার্থীদের জন্য)

বিভাগ ‘চ’

৬।১ একটি সম্পূর্ণ বাক্যে উত্তর দাও:

৬.১.১ ‘নীলদর্পণ’ নাটকটির রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘নীলদর্পণ’ নাটকটির রচয়িতা হলেন দীনবন্ধু মিত্র

৬.১.২ এশিয়াটিক সোসাইটি কোন বছর প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: এশিয়াটিক সোসাইটি ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়।

৬.১.৩ ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ কাদের বলা হয়?
উত্তর: শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের তিন মিশনারি— উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড-কে একত্রে ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ বলা হয়।

৬.১.৪ একজন ব্যঙ্গচিত্র শিল্পীর নাম করো।
উত্তর: একজন বিখ্যাত ব্যঙ্গচিত্র শিল্পীর নাম হলো গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

৬.১.৫ কে বর্ণপরিচয় রচনা করেন?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয় রচনা করেন।

৬.১.৬ কে ‘সর্দার’ উপাধিতে ভূষিত হন?
উত্তর: স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল ‘সর্দার’ উপাধিতে ভূষিত হন।

৬.২ দু’টি বা তিনটি বাক্যে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

৬.২.১ ডেভিড হেয়ার স্মরণীয় কেন?
উত্তর: ডেভিড হেয়ার ছিলেন একজন স্কটিশ ঘড়ি নির্মাতা, যিনি তাঁর জীবন বাংলার মানুষের মধ্যে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারে উৎসর্গ করেছিলেন। হিন্দু কলেজ, ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি এবং হেয়ার স্কুল প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকার জন্যই তিনি স্মরণীয়।

৬.২.২ ভারতসভা প্রতিষ্ঠার যে কোনো দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
উত্তর:
১. দেশের মানুষের মধ্যে শক্তিশালী রাজনৈতিক জনমত গঠন করা।
২. ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে ভারতের হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে ঐক্য ও মৈত্রী স্থাপন করা।

৬.২.৩ মোপলা বিদ্রোহ কেন হয়েছিল?
উত্তর: ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কেরালার মালাবার উপকূলে মুসলিম মোপলা কৃষকরা হিন্দু জমিদার (জেনমি) এবং ব্রিটিশ সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, বেআইনি কর এবং নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র আন্দোলন করেছিল, তা-ই মোপলা বিদ্রোহ।

৬.২.৪ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার স্মরণীয় কেন?
উত্তর: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন অকুতোভয় নারী বিপ্লবী এবং মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম সহযোদ্ধা। ১৯৩২ সালে ইউরোপীয় ক্লাব (পাহাড়তলী) আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে তিনি শহিদ হন, যা নারী সমাজকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

৬.২.৫ ‘রসিদ আলি দিবস’ কেন পালিত হয়েছিল?
উত্তর: আজাদ হিন্দ ফৌজের অন্যতম ক্যাপ্টেন আবদুল রসিদ আলিকে ব্রিটিশ সরকার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলে তার প্রতিবাদে ১৯৪৬ সালের ১১-১৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ব্যাপক গণ-আন্দোলন ও ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়, যা ‘রসিদ আলি দিবস’ নামে পরিচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top