মাধ্যমিক ইতিহাস সমাধান – ২০২২ (Madhyamik 2022 History Question Paper Solved)
মাধ্যমিকের চূড়ান্ত প্রস্তুতির এই পর্বে তোমাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক সাধুবাদ। সিলেবাস শেষ করার পর আগের বছরের প্রশ্নপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। তাই তোমাদের সুবিধার্থে আজকের এই পেজে আমরা শেয়ার করছি ‘মাধ্যমিক ২০২২ ইতিহাস প্রশ্নপত্র এবং তার সম্পূর্ণ সমাধান’ (Madhyamik 2022 History Question Paper Solution)। তবে রেডিমেড উত্তর পড়ার অভ্যাস কিন্তু সবসময় ভালো নয়! আমরা চাই, তোমরা প্রথমে নিজেদের পড়াশোনার ওপর ভরসা রেখে পুরো প্রশ্নপত্রটি একা একা সলভ করো। পরে নিজের খাতা যাচাই করার জন্য আমাদের এই নির্ভুল উত্তরমালার সাহায্য নাও। এভাবে এগোলে ইতিহাসে তোমরা নিশ্চিতভাবে সেরা স্কোর করতে পারবে।
বিভাগ ‘ক’
১। সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখ:
১.১ সত্যজিৎ রায় যুক্ত ছিলেন
(ক) খেলার ইতিহাসে
(খ) শহরের ইতিহাসে
(গ) নারীর ইতিহাসে
(ঘ) শিল্পচর্চার ইতিহাসে
উত্তর: (ঘ) শিল্পচর্চার ইতিহাসে
১.২ রেশম আবিষ্কৃত হয় প্রাচীন
(ক) ভারতে
(খ) রোমে
(গ) পারস্যে
(ঘ) চীনেদেশে
উত্তর: (ঘ) চীনেদেশে
১.৩ ‘নিষিদ্ধ শহর’ বলা হয়
(ক) লাসাকে
(খ) বেইজিংকে
(গ) রোমকে
(ঘ) কনস্ট্যান্টিনোপলকে
উত্তর: (ক) লাসাকে
১.৪ ‘বঙ্গদর্শন’ সাময়িক পত্রিকাটি ছিল একটি
(ক) সাপ্তাহিক পত্রিকা
(খ) পাক্ষিক পত্রিকা
(গ) মাসিক পত্রিকা
(ঘ) বাৎসরিক পত্রিকা
উত্তর: (গ) মাসিক পত্রিকা
১.৫ ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ছাপা হয়েছিল-
(ক) নদীয়াতে
(খ) ঢাকায়
(গ) শ্রীরামপুরে
(ঘ) কলকাতায়
উত্তর: (খ) ঢাকায়
১.৬ রামমোহন রায় এর পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজ পরিচালনা করেন-
(ক) অক্ষয়কুমার দত্ত
(খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ
(ঘ) তারাচাঁদ চক্রবর্তী
উত্তর: (গ) রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ
১.৭ বাঙালি পরিচালিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্রটি হল
(ক) সমাচার দর্পণ
(খ) সম্বাদ প্রভাকর
(গ) ব্রাহ্মণ সেবধি
(ঘ) বাঙাল গেজেটি
উত্তর: (ঘ) বাঙাল গেজেটি
১.৮ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম স্নাতক ছিলেন-
(ক) সৈয়দ আমীর আলি
(খ) আব্দুল লতিফ
(গ) দেলওয়ার হোসেন আহমেদ
(ঘ) সৈয়দ আহমেদ
উত্তর: (গ) দেলওয়ার হোসেন আহমেদ
১.৯ ঔপনিবেশিক অরণ্য আইনের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি আদিবাসী বিদ্রোহ হল
(ক) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ
(খ) চুয়াড় বিদ্রোহ
(গ) কোল বিদ্রোহ
(ঘ) রম্পা বিদ্রোহ
উত্তর: (ঘ) রম্পা বিদ্রোহ
১.১০ ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন
(ক) ভিনসেন্ট স্মিথ
(খ) জেমস মিল
(গ) ওয়ারেন হেস্টিংস
(ঘ) লর্ড কর্ণওয়ালিশ
উত্তর: (গ) ওয়ারেন হেস্টিংস
১.১১ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী কৃষক বিদ্রোহটি হল
(ক) চুয়াড় বিদ্রোহ
(খ) ফরাজি আন্দোলন
(গ) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ
(ঘ) সাঁওতাল বিদ্রোহ
উত্তর: (গ) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ
১.১২ মির নিশার আলি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন-
(ক) বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনে
(খ) ফরাজি আন্দোলনে
(গ) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহে
(ঘ) নীল বিদ্রোহে
উত্তর: (ক) বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনে
১.১৩ ‘রাষ্ট্রগুরু’ নামে পরিচিত ছিলেন
(ক) রামমোহন রায়
(খ) রাজনারায়ণ বসু
(গ) নবগোপাল মিত্র
(ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
উত্তর: (ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১.১৪ মহাবিদ্রোহকে (১৮৫৭) ‘কৃষক বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন-
(ক) সুরেন্দ্রনাথ সেন
(খ) রমেশচন্দ্র মজুমদার
(গ) শশীভূষণ চৌধুরি
(ঘ) বিনায়ক দামোদর সাভারকর
উত্তর: (গ) শশীভূষণ চৌধুরি
১.১৫ আনন্দমোহন বসু ছিলেন ভারত সভার
(ক) প্রতিষ্ঠাতা
(খ) সভাপতি
(গ) সহ-সভাপতি
(ঘ) সচিব
উত্তর: (ঘ) সচিব
১.১৬ ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি রচনা করেন
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ
উত্তর: (গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
১.১৭ বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা, জগদীশচন্দ্র বসু অধ্যাপক ছিলেন
(ক) গণিতশাস্ত্রের
(খ) রসায়নশাস্ত্রের
(গ) পদার্থবিদ্যার
(ঘ) উদ্ভিদবিদ্যার
উত্তর: (গ) পদার্থবিদ্যার
১.১৮ ‘বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল
(ক) ১৮৩৩ খ্রিঃ
(খ) ১৮৫৬ খ্রিঃ
(গ) ১৮৮০ খ্রিঃ
(ঘ) ১৯০৩ খ্রিঃ
উত্তর: (খ) ১৮৫৬ খ্রিঃ
১.১৯ ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ (১৯০৬)-এর প্রথম সভাপতি ছিলেন-
(ক) রাসবিহারী ঘোষ
(খ) অরবিন্দ ঘোষ
(গ) তারকনাথ পালিত
(ঘ) সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (ক) রাসবিহারী ঘোষ
১.২০ ‘দিগ্দর্শন’-এর সম্পাদক ছিলেন
(ক) উইলিয়াম কেরি
(খ) জোশুয়া মার্শম্যান
(গ) ফেলিক্স কেরি
(ঘ) জন ক্লার্ক মার্শম্যান
উত্তর: (ঘ) জন ক্লার্ক মার্শম্যান
বিভাগ ‘খ’
২। নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
উপবিভাগ: ২.১
একটি বাক্যে উত্তর দাও:
(২.১.১) কোন বছর ‘সোমপ্রকাশ’-এর প্রকাশনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়?
উত্তর: ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড লিটনের ‘দেশীয় সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন’ (Vernacular Press Act) পাসের কারণে ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার প্রকাশনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল।
(২.১.২) কলকাতার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যগুলির যেকোনো একটি উল্লেখ কর।
উত্তর: কলকাতার একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঔপনিবেশিক স্থাপত্য হল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল (Victoria Memorial)।
(২.১.৩) রেভাঃ জেমস লঙ্ কোন অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছিলেন?
উত্তর: দীনবন্ধু মিত্রের লেখা ‘নীলদর্পণ’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করার অপরাধে রেভারেন্ড জেমস লঙ অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা হয়েছিল।
(২.১.৪) ‘বিদ্যাহারাবলী’ গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
উত্তর: ‘বিদ্যাহারাবলী’ গ্রন্থটি রচনা করেন ফেলিক্স কেরি (Felix Carey), যা ছিল বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম শারীরস্থান বা অ্যানাটমি বিষয়ক গ্রন্থ।
উপবিভাগ: ২.২
ঠিক বা ভুল নির্ণয় কর:
(২.২.১) ভারতে কামান প্রথম ব্যবহৃত হয় পলাশীর যুদ্ধে।
উত্তর: ভুল। (ভারতে প্রথম কামানের ব্যবহার হয় ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে)।
(২.২.২) ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে মোহনবাগান ক্লাব আই.এফ.এ. শিল্ড জয় করেছিল।
উত্তর: ঠিক।
(২.২.৩) প্রথম বিধবা বিবাহ করেন শ্রীশচন্দ্র ন্যায়রত্ন।
উত্তর: ঠিক। (১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়)।
(২.২.৪) ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটির অন্যতম সম্পাদক ছিলেন প্রসন্নকুমার ঠাকুর।
উত্তর: ঠিক।
উপবিভাগ: ২.৩
‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ (সঠিক মেলানো) |
|---|---|
| (২.৩.১) লর্ড রিপন | (২) হান্টার কমিশন |
| (২.৩.২) রামমোহন রায় | (৪) অ্যাংলো হিন্দু স্কুল |
| (২.৩.৩) দ্বারকানাথ ঠাকুর | (১) জমিদার সভা |
| (২.৩.৪) তারকনাথ পালিত | (৩) বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট |
উপবিভাগ: ২.৪
প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখামানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত কর ও নামাঙ্কিত কর:
(২.৪.১) নীল বিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্র – নদীয়া।
উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে কলকাতা থেকে সামান্য উত্তরে নদিয়া জেলাকে চিহ্নিত করতে হবে।
(২.৪.২) কোল বিদ্রোহের এলাকা – ছোটনাগপুর।
উত্তর: বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচি সংলগ্ন ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলকে চিহ্নিত করতে হবে।
(২.৪.৩) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) অন্যতম কেন্দ্র – দিল্লি।
উত্তর: উত্তর ভারতে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত বর্তমান ভারতের রাজধানী শহর দিল্লিকে চিহ্নিত করতে হবে।
(২.৪.৪) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) অন্যতম কেন্দ্র – কানপুর।
উত্তর: উত্তরপ্রদেশের গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত কানপুর শহরকে চিহ্নিত করতে হবে।
অথবা (কেবলমাত্র দৃষ্টিহীন পরীক্ষার্থীদের জন্য)
শূন্যস্থান পূরণ কর:
(২.৪.১) ‘হুল’ কথাটির অর্থ হল _____।
উত্তর: ‘হুল’ কথাটির অর্থ হল বিদ্রোহ (বা অভ্যুত্থান)।
(২.৪.২) ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি রচনা করেন _____।
উত্তর: ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি রচনা করেন দীনবন্ধু মিত্র।
(২.৪.৩) ভারতের প্রথম ভাইসরয় ছিলেন _____।
উত্তর: ভারতের প্রথম ভাইসরয় ছিলেন লর্ড ক্যানিং।
(২.৪.৪) ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল _____ খ্রিষ্টাব্দে।
উত্তর: ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে।
উপবিভাগ: ২.৫
নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন কর:
(২.৫.১) বিবৃতি: ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্যাখ্যা ১: এই কলেজে শুধুমাত্র হিন্দু ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল।
ব্যাখ্যা ২: এই কলেজে হিন্দু ও ব্রাহ্ম ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল।
ব্যাখ্যা ৩: এই কলেজে সকল ধর্মের ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: এই কলেজে শুধুমাত্র হিন্দু ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল।
(২.৫.২) বিবৃতি: ঔপনিবেশিক সরকার উপজাতিদের জন্য ‘দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সী’ নামে একটি পৃথক অঞ্চল গঠন করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ১: এটি গঠিত হয়েছিল চুয়াড় বিদ্রোহের পর।
ব্যাখ্যা ২: এটি গঠিত হয়েছিল কোল বিদ্রোহের পর।
ব্যাখ্যা ৩: এটি গঠিত হয়েছিল মুণ্ডা বিদ্রোহের পর।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: এটি গঠিত হয়েছিল কোল বিদ্রোহের পর।
(২.৫.৩) বিবৃতি: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে জগদীশচন্দ্র বসু বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্যাখ্যা ১: এটি উদ্ভিদবিদ্যা গবেষণার উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্যাখ্যা ২: এটি বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্যাখ্যা ৩: এটি বিজ্ঞান গবেষণার উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: এটি বিজ্ঞান গবেষণার উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
(২.৫.৪) বিবৃতি: উনিশ শতকে বাংলার প্রকাশকগণ তাদের বই বিক্রির জন্য ফেরিওয়ালাদের উপর নির্ভর করতেন।
ব্যাখ্যা ১: কারণ, বইয়ের দোকান ছিল অত্যন্ত সীমিত।
ব্যাখ্যা ২: কারণ, বই বিক্রি করাকে নিম্নস্তরের পেশা বলে মনে করা হত।
ব্যাখ্যা ৩: কারণ, এটি ছিল সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছবার সুলভতম ও সহজতম উপায়।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: কারণ, এটি ছিল সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছবার সুলভতম ও সহজতম উপায়।
বিভাগ ‘গ’
৩। দু’টি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
৩.১ সামরিক ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব কী?
উত্তর: সামরিক ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ের যুদ্ধকৌশল, সমরাস্ত্রের ব্যবহার এবং সামরিক প্রযুক্তির বিবর্তন সম্পর্কে জানা যায়। এছাড়া, সমাজের উপর যুদ্ধের প্রভাব, সামরিক বাহিনীর গঠনতন্ত্র এবং একটি দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যা সামগ্রিক ইতিহাস চর্চাকে পূর্ণতা দান করে।
৩.২ ‘সরকারি নথিপত্র’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সরকারি নথিপত্র বা আর্কাইভাল রেকর্ডস বলতে বোঝায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার বা দেশীয় রাজন্যবর্গের তৈরি করা পুলিশি রিপোর্ট, গোয়েন্দা দপ্তরের রিপোর্ট, সরকারি আধিকারিকদের চিঠিপত্র এবং প্রশাসনিক নির্দেশিকা। এই নথিপত্রগুলি থেকে সমকালীন রাজনৈতিক আন্দোলন, জনবিক্ষোভ এবং ব্রিটিশ সরকারের দমনপীড়নের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়।
৩.৩ স্কুল বুক সোসাইটি কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে ডেভিড হেয়ার ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় বিদ্যালয়গুলির পাঠরত ছাত্রছাত্রীদের জন্য সুলভে বা বিনামূল্যে মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক রচনা, মুদ্রণ ও বিতরণ করা এবং ইংরেজি ও আঞ্চলিক ভাষায় আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
৩.৪ মধুসূদন গুপ্ত স্মরণীয় কেন?
উত্তর: পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত ছিলেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের একজন খ্যাতনামা শিক্ষক এবং প্রথম ভারতীয় শবব্যবচ্ছেদকারী। ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি তিনি চারজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে প্রথম মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ (Dissection) করেন, যা ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করার ক্ষেত্রে একটি সাহসী পদক্ষেপ।
৩.৫ লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর ‘শিক্ষা বিষয়ক নির্দেশনামা’ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ তাঁর শিক্ষা বিষয়ক নির্দেশনামায় ঘোষণা করেন যে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত ভারতীয়রা অগ্রাধিকার পাবে। এই নির্দেশনামার ফলে ভারতীয়দের মধ্যে পাশ্চাত্য বা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের প্রতি আগ্রহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়।
৩.৬ ‘বাংলার নবজাগরণ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার সংস্পর্শে এসে বাংলার সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে এক অভূতপূর্ব যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তাকে ‘বাংলার নবজাগরণ’ বা বেঙ্গল রেনেসাঁস বলা হয়। এর ফলে বাংলার সামাজিক কুসংস্কারগুলি দূর হয় এবং মানবতাবাদ ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটে।
৩.৭ ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হ’ল কেন?
উত্তর: ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল যোগ্য নেতৃত্বের অভাব এবং আন্দোলনের নির্দিষ্ট রূপরেখার অভাব। দুদু মিঞার মৃত্যুর পর এই আন্দোলন তার ধর্মীয় রূপ হারিয়ে ফেলে এবং ব্রিটিশ পুলিশ ও জমিদারদের সম্মিলিত দমননীতির ফলে এই কৃষকদের আন্দোলনটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে ও চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।
৩.৮ তিতুমীর স্মরণীয় কেন?
উত্তর: তিতুমীর বা মীর নিসার আলি ছিলেন বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধান নেতা। তিনি চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ও বারাসাত অঞ্চলে জমিদার, নীলকর এবং ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষকদের সংঘবদ্ধ করেন এবং নারকেলবেড়িয়া গ্রামে ‘বাঁশের কেল্লা’ নির্মাণ করে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে শহিদ হন।
৩.৯ শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি অংশ কেন মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) বিরোধিতা করেছিল?
উত্তর: উনিশ শতকের শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি বড় অংশ ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের আধুনিকীকরণের জন্য কল্যাণকর বলে মনে করত। তাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন যে, মহাবিদ্রোহ জয়যুক্ত হলে আবার সেকেলে সামন্ততান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসবে এবং দেশ জুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে, তাই তাঁরা ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে সমর্থন না করে ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়েছিলেন।
৩.১০ ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয় কেন?
উত্তর: ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন আঁকা হয় সমাজের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা, সামাজিক ত্রুটিবিচ্যুতি বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণকে হাস্যরস ও শ্লেষের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসনের ঔদ্ধত্য এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাবু সমাজের অন্ধ অনুকরণকে তীব্র সমালোচনা করে জনসচেতনতা তৈরি করার উদ্দেশ্যে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ শিল্পীরা ব্যঙ্গচিত্র আঁকতেন।
৩.১১ নবগোপাল মিত্র কে ছিলেন?
উত্তর: নবগোপাল মিত্র ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার একজন অন্যতম জাতীয়তাবাদী নেতা, যিনি ‘ন্যাশনাল মিত্র’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজনারায়ণ বসু ও দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহায়তায় ‘হিন্দু মেলা’ বা ‘চৈত্র মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘ন্যাশনাল পেপার’ পত্রিকা সম্পাদনা করে বাঙালিদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যবোধ জাগ্রত করেন।
৩.১২ উনিশ শতকের বাংলায় জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের কীরূপ ভূমিকা ছিল?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিভিন্ন উপন্যাস ও প্রবন্ধের মাধ্যমে উনিশ শতকের বাংলায় আধুনিক জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করেছিলেন। তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতটি ভারতীয় বিপ্লবীদের মূল মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম তরুণ সমাজকে আত্মত্যাগ ও স্বদেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
৩.১৩ জাতীয় শিক্ষা পরিষদ কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ প্রবর্তিত ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে বর্জন করে দেশীয় আদর্শে ও জাতীয় নিয়ন্ত্রণে ছাত্রছাত্রীদের কারিগরি, বিজ্ঞান ও সাহিত্য শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ বা ‘National Council of Education’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩.১৪ ‘বিদ্যাসাগর সাট’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বিদ্যাসাগর সাট (Vidyasagar Sort) বলতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক প্রবর্তিত বাংলা মুদ্রণের জন্য একটি নতুন ও সরল টাইপ বা অক্ষর বিন্যাসকে বোঝায়। বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালাকে সংস্কার করে যুক্তাক্ষরগুলিকে সরল করেন এবং মুদ্রণের সুবিধার্থে বাংলার সীসার হরফগুলিকে সুবিন্যস্ত করে একটি নতুন ছাঁচ তৈরি করেছিলেন, যা বাংলা ছাপাখানার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।
৩.১৫ বাংলা ছাপাখানার বিকাশে লাইনোটাইপ প্রবর্তনের গুরুত্ব কী?
উত্তর: ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে সুরেশচন্দ্র মজুমদার বাংলা মুদ্রণ শিল্পে লাইনোটাইপ (Linotype) বা একসঙ্গে পুরো এক লাইন অক্ষর ঢালাই করার পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। এর ফলে বাংলা বই ও সংবাদপত্র ছাপার কাজ আগের চেয়ে অনেক দ্রুত, নির্ভুল এবং সুলভ হয়, যা বাংলা প্রকাশনা শিল্পের প্রসারে এক বিরাট বিপ্লব নিয়ে আসে।
৩.১৬ গ্রামীণ শিল্প ও বৃত্তিশিক্ষার প্রসারে রবীন্দ্রনাথ-এর অবদান কীরূপ ছিল?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ শিল্প ও বৃত্তিমুখী শিক্ষার প্রসারের জন্য ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিনিকেতনের অদূরে ‘শ্রীনিকেতন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে তিনি কৃষিকাজ, পশুপালন, কুটিরশিল্প, তাঁত, মৃৎশিল্প প্রভৃতি বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে ছাত্রছাত্রীরা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীরা স্বনির্ভর হতে পারে।
বিভাগ ‘ঘ’
৪। সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
উপবিভাগ: ঘ.১
৪.১ উনিশ শতকে বাংলায় নারীশিক্ষা বিস্তারে রাজা রাধাকান্ত দেব কীরূপ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকে বাংলায় নারীশিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে যে কয়েকজন রক্ষণশীল হিন্দু পণ্ডিতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে রাজা রাধাকান্ত দেব অন্যতম। তিনি হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল গোষ্ঠীর নেতা হয়েও নারীশিক্ষার প্রসারে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
নারীশিক্ষায় উদ্যোগ ও ভূমিকা:
* ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটিকে সমর্থন: ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি’র অন্যতম সদস্য ছিলেন রাধাকান্ত দেব। তিনি এই সোসাইটির মাধ্যমে মেয়েদের বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগকে প্রবলভাবে সমর্থন করেন।
* স্ত্রী শিক্ষাবিধায়ক প্রকাশন: তিনি পণ্ডিত গৌরমােহন বিদ্যালঙ্কারের লেখা ‘স্ত্রী শিক্ষাবিধায়ক’ (১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে) নামক বইটি প্রকাশের ব্যাপারে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিলেন। এই বইটিতে প্রাচীন ভারতের নারীশিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে মেয়েদের শিক্ষার সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
* নিজগৃহে বিদ্যালয় স্থাপন: রক্ষণশীলদের বিরোধিতার কারণে বাইরের স্কুলে মেয়েদের পাঠানো কঠিন হওয়ায়, তিনি তাঁর নিজ বাসভবনে মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।
* পরীক্ষা গ্রহণ ও পুরস্কার বিতরণ: তাঁর বাড়িতে শুধু স্কুল স্থাপনই নয়, মেয়েদের পড়াশোনার অগ্রগতি দেখার জন্য তিনি পরীক্ষার ব্যবস্থাও করেছিলেন এবং কৃতকার্য ছাত্রীদের পুরস্কার প্রদান করে তাদের উৎসাহিত করতেন।
উপসংহার: যদিও তিনি প্রথাগত হিন্দু ধর্মের অনুরাগী ছিলেন, তবুও রাধাকান্ত দেব অনুধাবন করেছিলেন যে সমাজের সার্বিক উন্নতির জন্য নারীশিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর এই সংস্কারমুক্ত মানসিকতা উনিশ শতকের বাংলায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল।
৪.২ লর্ড মেকলে-কে কী এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তক বলা যায়?
উত্তর:
ভূমিকা: ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় টমাস ব্যাবিংটন মেকলে (Lord Macaulay) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নাম। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পেশ করা বিখ্যাত ‘মেকলে মিনিট’ (Macaulay’s Minute) ভারতের শিক্ষানীতির গতিপথ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছিল।
পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তক হিসেবে মেকলের ভূমিকা:
* প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বের অবসান: ভারতে ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষানীতি কেমন হবে—প্রাচ্য না পাশ্চাত্য, তা নিয়ে ১৮১৩ সাল থেকেই তীব্র দ্বন্দ্ব চলছিল। ১৮৩৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি মেকলে তাঁর মিনিটের মাধ্যমে জোরালো যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন যে ইংরেজি শিক্ষাই শ্রেষ্ঠ এবং ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষারই প্রসার হওয়া উচিত।
* ইংরেজি শিক্ষার সরকারি স্বীকৃতি: মেকলের সুপারিশের ভিত্তিতেই গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮৩৫ সালের ৭ই মার্চ ঘোষণা করেন যে, ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষাবাবদ সমস্ত অর্থ কেবল ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান প্রসারের জন্যই ব্যয় করা হবে।
* নিম্নমুখী পরিস্রুত নীতি (Downward Filtration Theory): মেকলে বিশ্বাস করতেন যে, সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হলে তা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এই নীতির ফলেই ভারতে ইংরেজি জানা একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়।
* আধুনিক চিন্তাধারার প্রসার: মেকলের উদ্যোগেই ভারতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার জোয়ার আসে, যার ফলে ভারতীয়রা আধুনিক পশ্চিমা দর্শন, বিজ্ঞান ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায়।
উপসংহার: যদিও রাজা রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ার প্রমুখ ব্যক্তিরা আগে থেকেই পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য আন্দোলন করছিলেন, কিন্তু মেকলেই সরকারিভাবে ভারতে ইংরেজি শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাই তাঁকে ভারতে পাশ্চাত্য বা ইংরেজি শিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রবর্তক ও রূপকার বলা যুক্তিসঙ্গত।
৪.৩ ঔপনিবেশিক সরকার কী উদ্দেশ্যে অরণ্য আইন প্রণয়ন করেছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার ভারতের বিশাল অরণ্য সম্পদের উপর নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৮৬৫, ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) একাধিক ‘অরণ্য আইন’ বা Forest Act প্রণয়ন করেছিল।
অরণ্য আইন প্রণয়নের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ:
* অরণ্য সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার: ব্রিটিশদের শিল্পবিপ্লব, জাহাজ নির্মাণ এবং বিশেষত ভারতে রেলপথ সম্প্রসারণের জন্য প্রচুর কাঠের প্রয়োজন ছিল। শাল, সেগুন প্রভৃতি মূল্যবান কাঠ সংগ্রহ করে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ চরিতার্থ করাই ছিল এই আইনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
* সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: অরণ্য আইনের মাধ্যমে সরকার বনভূমিকে ‘সংরক্ষিত’ (Reserved), ‘সুরক্ষিত’ (Protected) এবং ‘গ্রামীণ’ (Village) এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করে। এর ফলে অরণ্যের উপর থেকে আদিবাসী ও স্থানীয় মানুষের প্রথাগত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
* রাজস্ব বৃদ্ধি: অরণ্যজ সম্পদ (মধু, মোম, কাঠ, পাতা) সংগ্রহ এবং পশুচারণের ওপর কর আরোপ করে ব্রিটিশ সরকার তাদের রাজস্ব বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেছিল।
* আদিবাসীদের উচ্ছেদ: যুগ যুগ ধরে যে আদিবাসী ও উপজাতি সম্প্রদায় অরণ্যকে কেন্দ্র করে জীবনযাপন করত, তাদের অরণ্য থেকে উচ্ছেদ করে কৃষিকাজে বাধ্য করা এবং তাদের সস্তায় শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করাও সরকারের একটি সুপ্ত উদ্দেশ্য ছিল।
উপসংহার: মূলত নিজেদের অর্থনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষা করার জন্যই ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন প্রণয়ন করেছিল। এই আইনের ফলে অরণ্যনির্ভর আদিবাসী সমাজ চরম শোষণের শিকার হয়, যার ফলস্বরূপ পরবর্তীকালে সাঁওতাল, মুণ্ডা, কোল প্রভৃতি একাধিক উপজাতি বিদ্রোহের সূচনা ঘটেছিল।
৪.৪ নীল বিদ্রোহে সংবাদপত্রের ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর:
ভূমিকা: ১৮৫৯-৬০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় সংঘটিত নীল বিদ্রোহের বিস্তৃতি ও সাফল্যের পেছনে সমকালীন শিক্ষিত বাঙালি সমাজ এবং বিশেষ করে বাংলা সংবাদপত্রগুলির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নীল বিদ্রোহে সংবাদপত্রের ভূমিকা:
* হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার ভূমিকা: হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকা নীলকরদের অবর্ণনীয় অত্যাচার এবং নীলচাষিদের দুর্দশার কথা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছিল। হরিশচন্দ্র তাঁর নির্ভীক লেখনীর মাধ্যমে নীলচাষিদের পক্ষে জোরালো জনমত গঠন করেন।
* সোমপ্রকাশ ও অন্যান্য পত্রিকা: দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের ‘সোমপ্রকাশ’, অক্ষয়কুমার দত্তের ‘তত্ত্ববোধিনী’, এবং ‘সংবাদ প্রভাকর’ প্রভৃতি পত্রিকাগুলিও নিয়মিতভাবে নীলকর সাহেবদের নিষ্ঠুরতার খবর এবং কৃষকদের প্রতিরোধ সংগ্রামের কাহিনী ছাপতে থাকে।
* সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ: এই সংবাদপত্রগুলির লাগাতার প্রচারের ফলেই নীলকর সাহেবদের অত্যাচার কেবল গ্রাম বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা কলকাতা থেকে শুরু করে সুদূর লন্ডনের শাসকগোষ্ঠীর কানে গিয়েও পৌঁছেছিল।
* জনমত ও বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন: সংবাদপত্রগুলি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের চোখ খুলে দিয়েছিল। এর ফলে শিশির কুমার ঘোষ, মনমোহন ঘোষের মতো বুদ্ধিজীবীরা সরাসরি কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়ান এবং বিদ্রোহ একটি জাতীয় আন্দোলনের রূপ নেয়।
উপসংহার: নীল বিদ্রোহ কেবল কৃষকদের বাঁচার লড়াই ছিল না, এটি ছিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতারও এক বিরাট জয়। সংবাদপত্রগুলি কৃষকদের অভাব-অভিযোগকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরে ব্রিটিশ সরকারকে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে ‘নীল কমিশন’ গঠন করতে বাধ্য করেছিল।
উপবিভাগ: ঘ.২
৪.৫ জাতীয়তাবাদ প্রসারে হিন্দু মেলার ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালির মধ্যে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু ও দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে কলকাতায় ‘হিন্দু মেলা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রাথমিক নাম ছিল ‘চৈত্র মেলা’।
জাতীয়তাবাদ প্রসারে হিন্দু মেলার ভূমিকা:
* স্বদেশপ্রেমের জাগরণ: হিন্দু মেলার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষিত যুবসমাজের মনে দেশপ্রেমের বীজ বপন করা। মেলার বাৎসরিক অধিবেশনে দেশাত্মবোধক গান গাওয়া, কবিতা পাঠ এবং প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে শ্রোতাদের মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটানো হতো।
* দেশীয় শিল্পের প্রসার: এই মেলায় দেশীয় কারিগরদের তৈরি হস্তশিল্প, তাঁতের কাপড় ও অন্যান্য কুটির শিল্পের প্রদর্শনী হতো। এর মাধ্যমে বিদেশি দ্রব্য বর্জন এবং দেশীয় শিল্পজাত দ্রব্য ব্যবহারের প্রতি দেশবাসীকে উৎসাহিত করা হতো।
* শরীরচর্চা ও আত্মনির্ভরতা: তরুণ সমাজকে শারীরিকভাবে বলবান এবং মানসিকভাবে আত্মনির্ভর করে তোলার জন্য মেলায় লাঠিখেলা, কুস্তি, জিমন্যাস্টিকস প্রভৃতি দেশীয় শরীরচর্চা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো।
* ঐক্যবোধের সৃষ্টি: ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালিদের একত্রিত করে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের চেষ্টা হিন্দু মেলা থেকেই প্রথম শুরু হয়েছিল। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা “মিলে সব ভারত সন্তান” গানটি এই মেলার ঐক্যবদ্ধ রূপেরই প্রতীক ছিল।
উপসংহার: যদিও হিন্দু মেলা মূলত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তবুও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। এটিই প্রথম বাঙালির মনে স্বাদেশিকতা এবং আত্মনির্ভরতার ধারণা গভীরভাবে গেঁথে দিয়েছিল।
৪.৬ ‘গোরা’ উপন্যাসটিতে রবীন্দ্রনাথের যে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার পরিচয় পাওয়া যায় তা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর:
ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘গোরা’ (১৯১০) উপন্যাসটি বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ও মননশীল উপন্যাস। এই উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী ভাবধারা এবং দেশপ্রেমের এক অভূতপূর্ব আদর্শ তুলে ধরেছেন।
গোরা উপন্যাসে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা:
* বৃহত্তর ভারতীয় পরিচয়: উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গোরা প্রথম জীবনে ছিল একজন কট্টর হিন্দু রক্ষণশীল। কিন্তু উপন্যাসের শেষে সে যখন জানতে পারে যে সে জন্মসূত্রে আইরিশ, তখন তার সমস্ত জাতপাতের অহংকার চূর্ণ হয়। সে উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত পরিচয় হিন্দু, মুসলমান বা খ্রিস্টান নয়, সে কেবলই একজন ‘ভারতবর্ষীয়’।
* সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সর্বধর্মসমন্বয়: রবীন্দ্রনাথ গোরার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে ভারতের জাতীয়তাবাদ কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় বা জাতিগত গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না। হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম সকলের মিলনেই এক অখণ্ড ভারতের সৃষ্টি সম্ভব।
* গ্রাম ও সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা: গোরার চোখে প্রকৃত ভারতবর্ষ কেবল শহুরে শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে উপলব্ধি করেছিল যে দেশের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে গ্রামের সাধারণ, দরিদ্র ও নিপীড়িত কৃষকদের মধ্যে। তাদের মুক্তি ছাড়া দেশের মুক্তি অসম্ভব।
* অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা: রবীন্দ্রনাথ উগ্র ও অন্ধ জাতীয়তাবাদের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি গোরার চরিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে প্রকৃত দেশপ্রেম হলো মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সমাজের ভেদাভেদ দূর করা।
উপসংহার: ‘গোরা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ এক সংস্কারমুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবতাবাদী জাতীয়তাবাদের আদর্শ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সংকীর্ণতা মুক্ত হয়ে সমগ্র মানবজাতিকে আপন করে নেওয়াই হলো প্রকৃত ভারতীয়ত্ব ও জাতীয়তাবাদ।
৪.৭ ছাপাখানা বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে কীরূপ পরিবর্তন এনেছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: আঠারো শতকের শেষদিকে ইউরোপীয় মিশনারিদের হাত ধরে বাংলায় ছাপাখানার উদ্ভব ঘটে। উনিশ শতকে ছাপাখানার প্রসার বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল।
শিক্ষা বিস্তারে ছাপাখানার প্রভাব ও পরিবর্তনসমূহ:
* সুলভে পাঠ্যপুস্তক লাভ: ছাপাখানা আবিষ্কারের আগে বই হাতে লেখা হতো, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দুষ্প্রাপ্য। ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার ফলে প্রচুর পরিমাণে বই ছাপা শুরু হয় এবং ছাত্রছাত্রীরা খুব অল্প দামে বা বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক হাতে পেতে শুরু করে।
* শিক্ষার গণতান্ত্রিকীকরণ: আগে শিক্ষা শুধুমাত্র সমাজের উচ্চবিত্ত বা ব্রাহ্মণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ছাপা বই সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পায়, ফলে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটে।
* স্কুল বুক সোসাইটির ভূমিকা: ছাপাখানার ওপর নির্ভর করেই ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা লক্ষ লক্ষ বাংলা ও ইংরেজি পাঠ্যবই ছাপিয়ে স্কুলগুলিতে বিতরণ করে বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে এক জোয়ার নিয়ে আসে।
* ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ: ছাপাখানার ফলে বাংলা বানান ও ব্যাকরণের একটি নির্দিষ্ট রূপ তৈরি হয়। বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায় প্রমুখের রচিত ব্যাকরণ ও বর্ণপরিচয়মূলক গ্রন্থগুলি মুদ্রিত হওয়ায় শিশুশিক্ষার পথ অনেক সহজ হয়। তাছাড়া বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র প্রকাশের মাধ্যমে গণশিক্ষার প্রসার ঘটে।
উপসংহার: ছাপাখানা বাংলার শিক্ষাব্যবস্থাকে গুটিকয়েক মানুষের হাত থেকে মুক্ত করে আপামর জনসাধারণের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিল। এর ফলেই উনিশ শতকের বাংলায় শিক্ষা ও নবজাগরণের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।
৪.৮ বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকে বাংলা মুদ্রণ শিল্প ও প্রকাশনার ইতিহাসে একজন অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে কাজ শেখার পর তিনি নিজের উদ্যোগে ছাপাখানা ও প্রকাশনা ব্যবসা শুরু করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন।
ছাপাখানার বিকাশে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ভূমিকা:
* বাঙালি প্রকাশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ: গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ছিলেন প্রথম বাঙালি যিনি পেশাগতভাবে পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রয়ের ব্যবসায় স্বাধীনভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের কাজে দক্ষতা অর্জন করে কলকাতায় এসে ‘বাঙালি প্রেস’ বা ‘বেঙ্গল গেজেট প্রেস’ স্থাপন করেন।
* বই প্রকাশ ও অলংকরণ: ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ‘অন্নদামঙ্গল’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। এই বইটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এটিই প্রথম সচিত্র বাংলা মুদ্রিত বই। এতে রামচাঁদ রায় নামে এক বাঙালি শিল্পীর তৈরি করা সুন্দর ব্লক চিত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
* বাঙালি পরিচালিত প্রথম সংবাদপত্র: ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় এবং হরচন্দ্র রায়ের সহায়তায় ‘বাঙাল গেজেটি’ (Bangal Gazette) প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল কোনো বাঙালির দ্বারা পরিচালিত ও সম্পাদিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র।
* বইয়ের ব্যবসা ও প্রচার: তিনি শুধু বই ছাপিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, বই বিক্রির জন্য তিনি ফেরিওয়ালা নিয়োগ করেছিলেন যারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বই বিক্রি করত। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয় এবং বটতলার প্রকাশনা শিল্পের ভিত মজবুত হয়।
উপসংহার: গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ইউরোপীয়দের একচেটিয়া মুদ্রণ ব্যবসায় বাঙালিদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই বাংলা বই ছাপানো এবং প্রকাশনা একটি স্বাধীন ও লাভজনক বাঙালি শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
বিভাগ ‘ঙ’
৫। পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
৫.১ উনিশ শতকের বাংলায় ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে রামকৃষ্ণদেবের ভূমিকা সংক্ষেপে আলোচনা কর।
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকের বাংলায় যখন একদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে একদল নব্য শিক্ষিত যুবক হিন্দু ধর্মকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলে বর্জন করছিল এবং অন্যদিকে ব্রাহ্ম আন্দোলন হিন্দু সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করে তুলেছিল, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁর সহজ-সরল লোকজ ভাষা এবং অকৃত্রিম আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মে এক নবজাগরণের সূচনা করেন।
প্রেক্ষাপট: উনিশ শতকে ব্রাহ্ম ধর্ম, খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রচার এবং যুক্তিবাদী পাশ্চাত্য দর্শনের প্রভাবে প্রাচীন হিন্দু ধর্ম অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। হিন্দু ধর্মের আচার-সর্বস্বতা এবং জাতপাতের ভেদাভেদ সাধারণ মানুষকে ধর্মবিমুখ করে তুলছিল। এই পরিস্থিতিতে শ্রীরামকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়ে হিন্দু ধর্মের প্রকৃত সারমর্ম মানুষের সামনে তুলে ধরেন।
রামকৃষ্ণদেবের ধর্ম সংস্কার ও সমন্বয়বাদী আদর্শ:
* সর্বধর্ম সমন্বয়: শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তাঁর সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্টান সব ধর্মের লক্ষ্যই এক। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, “যতো মত, ততো পথ”। অর্থাৎ ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর পথ ভিন্ন হলেও গন্তব্য সবার একই।
* সহজ সরল ভাষায় উপদেশ: তিনি কোনো পণ্ডিত ছিলেন قلم, কিন্তু তাঁর মুখের সহজ সরল গ্রামীণ ভাষা, ছোট ছোট গল্প ও উপমা দিয়ে তিনি বেদান্তের কঠিন দার্শনিক তত্ত্বগুলি সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তুলেছিলেন।
* মূর্তিপূজার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা: ব্রাহ্ম সমাজ যখন মূর্তিপূজার তীব্র বিরোধিতা করছিল, তখন শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কালী সাধনার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে মূর্তিপূজা কেবল মাটির আরাধনা নয়, এটি নিরাকার ঈশ্বরের সাকার রূপের উপাসনা। তিনি মূর্তিপূজার মধ্যে দিয়ে সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছানোর পথ দেখিয়েছিলেন।
* জাতপাত ও ভেদাভেদের বিরোধিতা: তিনি মানুষের মধ্যে কোনো জাতপাত বা ধর্মের ভেদাভেদ মানতেন না। তাঁর কাছে মানবসেবাই ছিল ঈশ্বর সেবা। তিনি বলতেন, “জীবে দয়া নয়, শিবজ্ঞানে জীব সেবা”। তাঁর এই বাণীই পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
* শিক্ষিত সমাজের উপর প্রভাব: তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি ও সরলতায় মুগ্ধ হয়ে কেশবচন্দ্র সেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, গিরিশচন্দ্র ঘোষের মতো বহু আধুনিক শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী মানুষ তাঁর অনুগামীতে পরিণত হয়েছিলেন এবং হিন্দু ধর্মের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ফিরে পেয়েছিলেন।
উপসংহার: শ্রীরামকৃষ্ণদেব কোনো নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং প্রাচীন হিন্দু ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্যকে আধুনিক সমাজের উপযোগী করে নতুনরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর সর্বধর্মসমন্বয় এবং মানবতাবাদের আদর্শ উনিশ শতকের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে এক অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার করেছিল এবং আধুনিক ভারতের আধ্যাত্মিক নবজাগরণের পথপ্রদর্শক হিসেবে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
৫.২ সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী ছিল? এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হ’ল কেন?
উত্তর:
ভূমিকা: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ এবং ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ১৮শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৭৬৩-১৮০০ খ্রিঃ) বাংলায় যে তীব্র গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, তা সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ভবানী পাঠক, মজনু শাহ, দেবী চৌধুরানী প্রমুখের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ব্রিটিশদের আতঙ্কিত করে রেখেছিল।
সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
* প্রথম সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ: সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ছিল ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সুসংগঠিত এবং দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ। এটি প্রমাণ করেছিল যে ভারতীয়রা সহজে ব্রিটিশ শাসন মেনে নেয়নি।
* কৃষক ও সন্ন্যাসীদের ঐক্য: এই বিদ্রোহে হিন্দু সন্ন্যাসী এবং মুসলিম ফকিরদের পাশাপাশি সমাজের অত্যাচারিত জমিদার, সাধারণ কৃষক এবং পদচ্যুত সৈনিকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, যা হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক অপূর্ব নিদর্শন।
* গেরিলা যুদ্ধকৌশল: বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান না হলেও, বাংলার নদী-নালা ও জঙ্গল ঘেরা ভৌগোলিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে ব্রিটিশ বাহিনীকে বারবার পর্যুদস্ত করেছিল।
* ভবিষ্যৎ বিদ্রোহের প্রেরণা: যদিও এই বিদ্রোহ সফল হয়নি, কিন্তু এটি বাংলার বুকে স্বাধীনতাকামীদের মনে এক গভীর ছাপ রেখে গিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের পটভূমি ছিল এই সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, যা পরবর্তীকালে ভারতীয় বিপ্লবীদের প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার কারণ:
* সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভাব: এই বিদ্রোহের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক রূপরেখা ছিল না। ব্রিটিশদের বিতাড়িত করার পর কী ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে বিদ্রোহীদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল কাশী।
* যোগ্য নেতৃত্বের অভাব: ভবানী পাঠক ও মজনু শাহের মতো যোগ্য নেতাদের মৃত্যুর পর এই বিদ্রোহ সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দিশাহারা হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় সারির নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন পরিচালনা করতে ব্যর্থ হন।
* উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ও ব্রিটিশ সেনাপতিদের দক্ষতা: ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে ছিল উন্নত বন্দুক ও কামান, অন্যদিকে বিদ্রোহীদের প্রধান অস্ত্র ছিল তীর-ধনুক, বল্লম ও তলোয়ার। এছাড়া ওয়ারেন হেস্টিংসের কঠোর দমননীতি এবং ব্রিটিশ সেনাপতিদের রণকৌশলের কাছে বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি।
* যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব: বিদ্রোহীদের বিভিন্ন দল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আন্দোলন করত। তাদের মধ্যে সঠিক সমন্বয় ও যোগাযোগের চরম অভাব ছিল, যার ফলে ব্রিটিশরা তাদের আলাদা আলাদাভাবে সহজেই দমন করতে সক্ষম হয়।
উপসংহার: সার্বিকভাবে ব্যর্থ হলেও সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ছিল পরাধীন ভারতের প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এই বিদ্রোহ ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা তীব্র হতে পারে।
৫.৩ হ্যালহেডের ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ কেন? বাংলা ছাপাখানার বিকাশে চার্লস উইলকিন্স-এর ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর:
ভূমিকা: বাংলা ভাষা, ব্যাকরণ এবং মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (N. B. Halhed) রচিত ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) একটি মাইলফলক। অন্যদিকে, এই বইটির মুদ্রণের সঙ্গেই যুক্ত চার্লস উইলকিন্স (Charles Wilkins) বাংলা ছাপাখানার বিকাশে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন।
হ্যালহেডের ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ গ্রন্থটির গুরুত্ব:
* প্রথম বিজ্ঞানসম্মত বাংলা ব্যাকরণ: এটিই ছিল আধুনিক পদ্ধতিতে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে লেখা বাংলা ভাষার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ গ্রন্থ। ইংরেজ সিভিলিয়ানদের দ্রুত বাংলা ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যেই তিনি এটি রচনা করেছিলেন।
* বাংলা হরফের প্রথম ব্যবহার: এই গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো, এই বইটি ছাপানোর জন্যই সর্বপ্রথম বাংলা মুদ্রাক্ষর বা টাইপ তৈরি করা হয়েছিল। এই বইটিতে ইংরেজি লেখার পাশাপাশি উদাহরণ বোঝানোর জন্য বাংলা হরফ ব্যবহার করা হয়েছিল।
* বাংলা গদ্যের বিকাশে অবদান: হ্যালহেড তাঁর এই গ্রন্থে বাংলা ভাষার স্বাধীন সত্তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ও ফারসি শব্দের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করে বাংলা গদ্যের একটি মান্য রূপ গঠনে সাহায্য করেছিলেন।
বাংলা ছাপাখানার বিকাশে চার্লস উইলকিন্স-এর ভূমিকা:
* বাংলা মুদ্রাক্ষরের জনক: চার্লস উইলকিন্সকে ‘বাংলার গুটেনবার্গ’ বা বাংলা মুদ্রাক্ষরের জনক বলা হয়। হ্যালহেডের ব্যাকরণ বইটি ছাপানোর জন্য তিনিই প্রথম নিজের হাতে ইস্পাত কেটে, ছেনি দিয়ে খোদাই করে বাংলা সীসার হরফ তৈরি করেছিলেন।
* চুঁচুড়ায় ছাপাখানা স্থাপন: তিনি হুগলী জেলার চুঁচুড়ায় ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার প্রথম নিজস্ব ছাপাখানা স্থাপন করেন এবং অ্যান্ড্রুজের প্রেসে তাঁর তৈরি বাংলা হরফ ব্যবহার করে হ্যালহেডের বইটি মুদ্রিত করেন।
* দেশীয় কারিগরদের প্রশিক্ষণ: উইলকিন্স কেবল নিজেই হরফ তৈরি করেননি, তিনি পঞ্চানন কর্মকার নামে এক সুদক্ষ বাঙালি স্বর্ণকারকে এই কাজে নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে হরফ নির্মাণে প্রশিক্ষণ দেন। পঞ্চানন কর্মকার পরবর্তীকালে বাংলা মুদ্রণ শিল্পে এক অসাধারণ অবদান রেখেছিলেন।
* মুদ্রণ শিল্পের ভিত স্থাপন: উইলকিন্সের তৈরি করা এই বাংলা ছাঁচ বা টাইপের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস এবং অন্যান্য বাঙালি ছাপাখানাগুলি বিকাশ লাভ করেছিল। তাঁর এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ছাড়া বাংলায় বই প্রকাশনার বিপ্লব সম্ভব হতো উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল।
উপসংহার: হ্যালহেড এবং উইলকিন্স, এই দুই ইংরেজ পণ্ডিতের যৌথ প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষা ও মুদ্রণ শিল্প এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল। উইলকিন্সের বাংলা হরফ আবিষ্কার ছিল বাংলার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
বিভাগ ‘চ’ (কেবলমাত্র বহিরাগত পরীক্ষার্থীদের জন্য)
৬.১ একটি পূর্ণ বাক্যে উত্তর দাও:
৬.১.১ কোন বছর ‘বঙ্গদর্শন’ প্রকাশিত হয়?
উত্তর: ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়।
৬.১.২ নীল কমিশন কবে গঠিত হয়?
উত্তর: নীলচাষিদের অভাব-অভিযোগ তদন্ত করার জন্য ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে (৩১শে মার্চ) ব্রিটিশ সরকার ‘নীল কমিশন’ গঠন করে।
৬.১.৩ কোন বছর হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে (২০শে জানুয়ারি) ডেভিড হেয়ার, স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট ও বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
৬.১.৪ ভাগনাডিহিতে কোন্ বিদ্রোহের সূচনা হয়?
উত্তর: ভাগনাডিহির মাঠে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে (৩০শে জুন) সিধু ও কানহুর নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহের (হুল) সূচনা হয়।
৬.১.৫ ‘ভারতমাতা’ চিত্রটিকে এঁকেছিলেন?
উত্তর: ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পটভূমিতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি এঁকেছিলেন।
৬.১.৬ বসু বিজ্ঞান মন্দির কে প্রতিষ্ঠা করেন?
উত্তর: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে (৩০শে নভেম্বর) প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতায় ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ (Bose Institute) প্রতিষ্ঠা করেন।
৬.২ দু’টি বা তিনটি বাক্যে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
৬.২.১ ডেভিড হেয়ার বিখ্যাত কেন?
উত্তর: ডেভিড হেয়ার পেশায় একজন ঘড়ি-নির্মাতা হলেও, তিনি তাঁর সমগ্র জীবন ও সম্পদ বাংলার শিক্ষা বিস্তারের কাজে ব্যয় করেছিলেন। তিনি হিন্দু কলেজ (১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে), হেয়ার স্কুল এবং ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রধান উদ্যোগী ছিলেন বলে বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি চিরস্মরণীয়।
৬.২.২ ‘বিপ্লব’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘বিপ্লব’ বলতে বোঝায় প্রচলিত কোনো ব্যবস্থা, সমাজ, রাজনীতি বা অর্থনীতির দ্রুত, আকস্মিক এবং আমূল পরিবর্তন। যেমন, ফরাসি বিপ্লব বা রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব একটি দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছিল।
৬.২.৩ ভারত সভা প্রতিষ্ঠার দু’টি উদ্দেশ্য লেখ।
উত্তর: ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ভারত সভার (Indian Association) প্রধান দুটি উদ্দেশ্য ছিল: ১) দেশের জনগণের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ ও সুদৃঢ় জনমত গঠন করা, এবং ২) সমস্ত ভারতবাসীকে হিন্দু-মুসলিম ধর্ম নির্বিশেষে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ করা।
৬.২.৪ পঞ্চানন কর্মকার স্মরণীয় কেন?
উত্তর: পঞ্চানন কর্মকার ছিলেন একজন সুদক্ষ বাঙালি স্বর্ণকার এবং হরফ নির্মাতা। চার্লস উইলকিন্সের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি অত্যন্ত সুন্দর ও নিখুঁত বাংলা মুদ্রাক্ষর (টাইপ) তৈরি করেন এবং শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে যোগ দিয়ে বাংলা মুদ্রণ শিল্পে এক যুগান্তকারী বিপ্লব নিয়ে আসেন।
৬.২.৫ কী উদ্দেশ্যে ‘শ্রীনিকেতন’ গড়ে ওঠে?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের অদূরে ‘শ্রীনিকেতন’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মূলত প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ শিল্প ও বৃত্তিমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটানোর উদ্দেশ্যে। এর লক্ষ্য ছিল গ্রামবাসীদের কৃষিকাজ, কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর করে তোলা।

