Madhyamik 2020 History Question Paper Solved

2020 মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমাধান

মাধ্যমিক ইতিহাস সমাধান – ২০২০ (Madhyamik 2020 History Question Paper Solved)

মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার জন্য বিগত বছরের প্রশ্ন সলভ করার কোনো বিকল্প নেই। তোমাদের ইতিহাস প্রস্তুতির সুবিধার্থে আজ আমরা নিয়ে এসেছি ‘মাধ্যমিক ২০২০ ইতিহাস প্রশ্নপত্র ও সম্পূর্ণ সমাধান’ (Madhyamik 2020 History Question Paper Solution)। তবে সরাসরি উত্তরগুলি দেখার আগে তোমাদের প্রতি আমাদের একটি বিশেষ পরামর্শ রইল—প্রথমে বাড়িতে বসে ঘড়ি ধরে নিজে নিজে পুরো প্রশ্নপত্রটি সমাধান করার চেষ্টা করো। এরপর আমাদের তৈরি করা এই নির্ভুল উত্তরমালায় তোমার লেখা উত্তরগুলো মিলিয়ে নাও। এভাবে অনুশীলন করলে তোমার দুর্বলতাগুলো সহজেই ধরা পড়বে এবং ফাইনাল পরীক্ষার জন্য আত্মবিশ্বাসও অনেক গুণ বেড়ে যাবে। চলো, তাহলে প্রস্তুতি শুরু করা যাক!

বিভাগ ‘ক’

১। সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখ:

১.১ ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালিত হয়-
(ক) ৮ই জানুয়ারি
(খ) ২৪শে ফেব্রুয়ারি
(গ) ৮ই মার্চ
(ঘ) ৫ই জুন
উত্তর: (ঘ) ৫ই জুন

১.২ ভারতীয়রা আলুর ব্যবহার শিখেছিল যাদের কাছ থেকে-
(ক) পর্তুগিজ
(খ) ইংরেজ
(গ) মুঘল
(ঘ) ওলন্দাজ
উত্তর: (ক) পর্তুগিজ

১.৩ প্রথম সরকারি শিক্ষা কমিশন (হান্টার কমিশন) গঠিত হয়-
(ক) ১৮৭২ খ্রিঃ
(খ) ১৮৭৮ খ্রিঃ
(গ) ১৮৮২ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৯০ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৮৮২ খ্রিঃ

১.৪ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম সমাজে যোগ দেন-
(ক) ১৮৩০ খ্রিঃ
(খ) ১৮৩৩ খ্রিঃ
(গ) ১৮৪৩ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৫০ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৮৪৩ খ্রিঃ

১.৫ বাংলার নবজাগরণ ছিল-
(ক) ব্যক্তিকেন্দ্রিক
(খ) প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক
(গ) কলকাতাকেন্দ্রিক
(ঘ) গ্রামকেন্দ্রিক
উত্তর: (গ) কলকাতাকেন্দ্রিক

১.৬ দ্বিতীয় অরণ্য আইনে (১৮৭৮) লাভবান হয়েছিল-
(ক) আদিবাসী সম্প্রদায়
(খ) ব্রিটিশ সরকার
(গ) ব্যবসায়ী শ্রেণি
(ঘ) ব্রিটিশ সরকার ও আদিবাসী শ্রেণি উভয়েই
উত্তর: (খ) ব্রিটিশ সরকার

১.৭ ‘হুল’ কথাটির অর্থ হল-
(ক) ঈশ্বর
(খ) স্বাধীনতা
(গ) অস্ত্র
(ঘ) বিদ্রোহ
উত্তর: (ঘ) বিদ্রোহ

১.৮ মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) প্রধান উদ্দেশ্য ছিল-
(ক) ভারতবাসীর আনুগত্য অর্জন
(খ) ভারতে ব্রিটিশদের একচেটিয়া ব্যবসার অধিকার লাভ
(গ) ভারতীয় প্রজাদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার প্রদান
(ঘ) মহাবিদ্রোহে (১৮৫৭) বন্দী ভারতীয়দের মুক্তিদান
উত্তর: (ক) ভারতবাসীর আনুগত্য অর্জন

১.৯ ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটির সভাপতি ছিলেন–
(ক) রাজা রাধাকান্ত দেব
(খ) প্রসন্নকুমার ঠাকুর
(গ) রাজা রামমোহন রায়
(ঘ) দ্বারকানাথ ঠাকুর
উত্তর: (ক) রাজা রাধাকান্ত দেব

১.১০ হিন্দু মেলার সম্পাদক ছিলেন-
(ক) নবগোপাল মিত্র
(খ) গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) রাজনারায়ণ বসু
(ঘ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
উত্তর: (খ) গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর

১.১১ বাংলা ভাষায় প্রথম বই ছাপা হয়–
(ক) ১৫৫৬ খ্রিঃ
(খ) ১৭৭৮ খ্রিঃ
(গ) ১৭৮৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮০০ খ্রিঃ
উত্তর: (খ) ১৭৭৮ খ্রিঃ

১.১২ বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন-
(ক) অরবিন্দ ঘোষ
(খ) সতীশচন্দ্র বসু
(গ) যোগেশচন্দ্র ঘোষ
(ঘ) প্রমথনাথ বসু
উত্তর: (ঘ) প্রমথনাথ বসু

১.১৩ ‘দেশপ্রাণ’ নামে পরিচিত ছিলেন–
(ক) সতীশচন্দ্র সামন্ত
(খ) অশ্বিনীকুমার দত্ত
(গ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
(ঘ) যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত
উত্তর: (গ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল

১.১৪ মোপলা বিদ্রোহ (১৯২১) হয়েছিল-
(ক) মালাবার উপকূলে
(খ) কোঙ্কন উপকূলে
(গ) গোদাবরী উপত্যকায়
(ঘ) তেলেঙ্গানা অঞ্চলে
উত্তর: (ক) মালাবার উপকূলে

১.১৫ ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ (১৯২৯) হয়েছিল-
(ক) জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে
(খ) বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে
(গ) শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে
(ঘ) কৃষক নেতাদের বিরুদ্ধে
উত্তর: (গ) শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে

১.১৬ ‘নারী সত্যাগ্রহ সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল-
(ক) বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে
(খ) অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে
(গ) আইন-অমান্য আন্দোলনের সময়ে
(ঘ) ভারত-ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে
উত্তর: (গ) আইন-অমান্য আন্দোলনের সময়ে

১.১৭ ‘মাস্টার-দা’ নামে পরিচিত ছিলেন–
(ক) বেণীমাধব দাস
(খ) সূর্য সেন
(গ) কৃষ্ণকুমার মিত্র
(ঘ) হেমচন্দ্র ঘোষ
উত্তর: (খ) সূর্য সেন

১.১৮ মাদ্রাজে ‘আত্মসম্মান আন্দোলন’ শুরু করেন-
(ক) রামস্বামী নাইকার
(খ) নারায়ণ গুরু
(গ) ভীমরাও আম্বেদকর
(ঘ) গান্ধিজি
উত্তর: (ক) রামস্বামী নাইকার

১.১৯ স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতের সবচেয়ে বড় দেশীয় রাজ্য ছিল-
(ক) কাশ্মীর
(খ) জুনাগড়
(গ) হায়দ্রাবাদ
(ঘ) জয়পুর
উত্তর: (গ) হায়দ্রাবাদ

১.২০ পুনর্গঠিত কেরল রাজ্যটি অবস্থিত ছিল-
(ক) গোদাবরী উপত্যকায়
(খ) দক্ষিণ উড়িষ্যায়
(গ) কাথিয়াবাড় উপদ্বীপে
(ঘ) মালাবার উপকূলে
উত্তর: (ঘ) মালাবার উপকূলে


বিভাগ ‘খ’

২। নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

উপবিভাগ: ২.১
একটি বাক্যে উত্তর দাও:

(২.১.১) বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী গ্রন্থের নাম কী?
উত্তর: বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী গ্রন্থের নাম ‘সত্তর বৎসর’।

(২.১.২) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় উপাচার্য কে ছিলেন?
উত্তর: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় উপাচার্য ছিলেন স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।

(২.১.৩) কত খ্রিষ্টাব্দে ‘নীল কমিশন’ গঠিত হয়?
উত্তর: ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে নীলচাষিদের দুর্দশা তদন্তের জন্য ‘নীল কমিশন’ গঠিত হয়।

(২.১.৪) ‘বর্ণপরিচয়’ কে রচনা করেন?
উত্তর: ‘বর্ণপরিচয়’ রচনা করেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

উপবিভাগ: ২.২
ঠিক বা ভুল নির্ণয় কর:

(২.২.১) ‘নদীয়াকাহিনী’ গ্রন্থটি ‘শহরের ইতিহাস’-এর অন্তর্গত।
উত্তর: ভুল। (এটি স্থানীয় ইতিহাসের অন্তর্গত)।

(২.২.২) বাবা রামচন্দ্র ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের নেতা।
উত্তর: ভুল। (তিনি উত্তরপ্রদেশের এক কৃষক নেতা ছিলেন)।

(২.২.৩) ফরোয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করেন সুভাষচন্দ্র বসু।
উত্তর: ঠিক।

(২.২.৪) লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রতিষ্ঠা করেন বাসন্তী দেবী।
উত্তর: ভুল। (এটি সরলা দেবী চৌধুরানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন)।

উপবিভাগ: ২.৩
‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও:

‘ক’ স্তম্ভ‘খ’ স্তম্ভ (সঠিক মেলানো)
(২.৩.১) টমাস ব্যাবিংটন মেকলে(৩) পাশ্চাত্য শিক্ষা
(২.৩.২) কেশবচন্দ্র সেন(৪) নববিধান
(২.৩.৩) রাজা রাধাকান্ত দেব(১) ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি
(২.৩.৪) স্বামী বিবেকানন্দ(২) বর্তমান ভারত

উপবিভাগ: ২.৪
প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখামানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত কর ও নামাঙ্কিত কর:

(২.৪.১) বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের কেন্দ্র – বারাসাত।
উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত অঞ্চল চিহ্নিত করতে হবে।

(২.৪.২) নীল বিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্র – যশোহর-নদিয়া।
উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন যশোহর অঞ্চল চিহ্নিত করতে হবে।

(২.৪.৩) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) অন্যতম কেন্দ্র – মিরাট।
উত্তর: উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাংশে দিল্লি সংলগ্ন মিরাট শহরটি চিহ্নিত করতে হবে।

(২.৪.৪) পুনর্গঠিত রাজ্য (১৯৬০) – মহারাষ্ট্র।
উত্তর: ভারতের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত মহারাষ্ট্র রাজ্যটি চিহ্নিত করতে হবে।

অথবা (কেবলমাত্র দৃষ্টিহীন পরীক্ষার্থীদের জন্য)
শূন্যস্থান পূরণ কর:

(২.৪.১) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের একজন নেতা ছিলেন _____।
উত্তর: সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের একজন নেতা ছিলেন ভবানী পাঠক (বা মজনু শাহ)।

(২.৪.২) নীল বিদ্রোহের একটি কেন্দ্র ছিল _____।
উত্তর: নীল বিদ্রোহের একটি কেন্দ্র ছিল নদীয়ার চৌগাছা গ্রাম

(২.৪.৩) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭ খ্রিঃ) সময়ে ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন _____।
উত্তর: মহাবিদ্রোহের সময়ে ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড ক্যানিং

(২.৪.৪) হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় _____ খ্রিষ্টাব্দে।
উত্তর: হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে।

উপবিভাগ: ২.৫
নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন কর:

(২.৫.১) বিবৃতি: হ্যালহেড তাঁর বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ লেখেন এদেশীয় ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা ভাষা শেখাবার জন্য।
ব্যাখ্যা ১: কারণ, এদেশের ইংরেজ কর্মচারীরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন।
ব্যাখ্যা ২: কারণ, বাংলা ভাষা না জানলে ইংরেজ কর্মচারীদের পদোন্নতি হত না।
ব্যাখ্যা ৩: কারণ, এদেশে বাণিজ্য ও প্রশাসন চালাবার জন্য ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা ভাষা আয়ত্ত করা প্রয়োজন ছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: কারণ, এদেশে বাণিজ্য ও প্রশাসন চালাবার জন্য ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা ভাষা আয়ত্ত করা প্রয়োজন ছিল।

(২.৫.২) বিবৃতি: বারদৌলি সত্যাগ্রহ অনুষ্ঠিত হয় ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে
ব্যাখ্যা ১: এই আন্দোলন ছিল, ভূ-স্বামী ধনী কৃষকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভূমিহীন দরিদ্র কৃষি-শ্রমিকদের আন্দোলন।
ব্যাখ্যা ২: এই আন্দোলন ছিল, ভূমিরাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিবাদে সরকারের বিরুদ্ধে ভূ-স্বামী ধনী কৃষক-শ্রেণির আন্দোলন।
ব্যাখ্যা ৩: এই আন্দোলন ছিল, ভূমিরাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিবাদে ভূ-স্বামী ধনী কৃষক শ্রেণি এবং ভূমিহীন দরিদ্র কৃষক শ্রেণির মিলিত আন্দোলন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: এই আন্দোলন ছিল, ভূমিরাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিবাদে সরকারের বিরুদ্ধে ভূ-স্বামী ধনী কৃষক-শ্রেণির আন্দোলন। (বারদৌলি সত্যাগ্রহ মূলত পতিদার কৃষকদের দ্বারা রাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিবাদে হয়েছিল)।

(২.৫.৩) বিবৃতি: ভারত ছাড়ো আন্দোলনের (১৯৪২) সময়ে ভোগেশ্বরী ফুকননী পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন।
ব্যাখ্যা ১: ভোগেশ্বরী ফুকননী পুলিশের সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামে মারা যান।
ব্যাখ্যা ২: পলাতকা বিপ্লবী ভোগেশ্বরী ফুকননী আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃত হলে পুলিশ তাঁকে গুলি করে।
ব্যাখ্যা ৩: ভোগেশ্বরী ফুকননী অসমের নওগাঁ জেলার পুলিশ থানায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে মারা যান।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: ভোগেশ্বরী ফুকননী অসমের নওগাঁ জেলার পুলিশ থানায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে মারা যান।

(২.৫.৪) বিবৃতি: সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার (১৯৩২) মাধ্যমে অনুন্নত শ্রেণিদের পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলে গান্ধিজি তার প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করেন।
ব্যাখ্যা ১: গান্ধিজি ছিলেন অনুন্নত শ্রেণিদের নির্বাচনী অধিকারের বিরোধী।
ব্যাখ্যা ২: হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরীর প্রতিবাদে গান্ধিজি অনশন করেন।
ব্যাখ্যা ৩: জাতীয় কংগ্রেসের নির্দেশে গান্ধিজি প্রতিবাদী অনশন করেছিলেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরীর প্রতিবাদে গান্ধিজি অনশন করেন।


বিভাগ ‘গ’

৩। দু’টি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

৩.১ আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চার উপাদান রূপে ‘সরকারি নথিপত্রে’র সীমাবদ্ধতা কী?
উত্তর: সরকারি নথিপত্র মূলত ব্রিটিশ প্রশাসক বা পুলিশ আধিকারিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা হতো, তাই এতে অনেক সময়ই স্থানীয় মানুষদের প্রকৃত ক্ষোভ বা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র আড়াল করা হতো। সাম্রাজ্যবাদী অহমিকা এবং পক্ষপাতিত্ব থাকার কারণে এই নথিপত্রগুলি নিরপেক্ষ নয় এবং ইতিহাস রচনার জন্য এদের তথ্যের সত্যতা যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন।

৩.২ আত্মজীবনী এবং স্মৃতিকথা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: আত্মজীবনী হলো কোনো ব্যক্তির নিজের লেখা নিজের জীবনের ধারাবাহিক ঘটনাবলি, অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির প্রামাণ্য দলিল। অন্যদিকে, স্মৃতিকথা হলো জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে কোনো বিশেষ ঘটনা বা নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে লেখা বিবরণ, যা ইতিহাস চর্চার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

৩.৩ এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: খ্রিষ্টান মিশনারিদের পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়ে তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা, যাতে তারা সহজেই খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোয় হিন্দু সমাজের কুসংস্কার দূর হলে ধর্মপ্রচারের কাজটি অনেক বেশি সহজ হবে।

৩.৪ ‘নববিধান’ কী?
উত্তর: ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্ম সমাজের প্রখ্যাত নেতা কেশবচন্দ্র সেন হিন্দু, ইসলাম, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টধর্মের সারমর্ম নিয়ে যে নতুন একটি সর্বধর্মসমন্বয়বাদী এবং উদার ধর্মাদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ‘নববিধান’ (New Dispensation) নামে পরিচিত।

৩.৫ চুয়াড় বিদ্রোহের (১৭৯৮-১৭৯৯) গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: চুয়াড় বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলার প্রথম সংগঠিত কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহ, যা ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই বিদ্রোহের ফলেই ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে মেদিনীপুরে চুয়াড়দের শান্ত করার জন্য জঙ্গলমহল নামে একটি পৃথক জেলা গঠন করে এবং অনেক জমিদারকে তাদের জমি ফিরিয়ে দেয়।

৩.৬ ফরাজি আন্দোলন কী নিছক ধর্মীয় আন্দোলন ছিল?
উত্তর: ফরাজি আন্দোলন প্রথমদিকে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও এটি নিছক ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না। হাজি শরিয়তউল্লাহ এবং তাঁর পুত্র দুদু মিঞার নেতৃত্বে এটি ক্রমশ বাংলার নীলকর সাহেব, ব্রিটিশ সরকার এবং অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি তীব্র কৃষক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।

৩.৭ ‘ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি’ কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি’ বা জমিদার সভার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলার জমিদারদের স্বার্থরক্ষা করা, ব্রিটিশ সরকারের নিষ্কর জমি অধিগ্রহণ নীতির তীব্র প্রতিবাদ করা এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জমিদারদের দাবিদাওয়াগুলি সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

৩.৮ উনিশ শতকে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটির কীরূপ অবদান ছিল?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি দেশবাসীকে মাতৃভূমির প্রতি চরম আত্মত্যাগের শিক্ষা দিয়েছিল। এই উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ গানটি ভারতীয় বিপ্লবীদের মূল মন্ত্রে পরিণত হয় এবং দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিল।

৩.৯ বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশের প্রভাব কতটা?
উত্তর: ছাপাখানার বিকাশের ফলে সুলভে প্রচুর পাঠ্যবই এবং সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে শুরু করে, যা বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও আধুনিক চিন্তাধারার ব্যাপক প্রসার ঘটায়। বাংলা সাহিত্য, বিজ্ঞান চর্চা এবং সামাজিক সংস্কার আন্দোলন ছাপাখানার মাধ্যমেই সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে বাংলার নবজাগরণকে ত্বরান্বিত করেছিল।

৩.১০ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ ছিল কেন?
উত্তর: ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য সস্তায় কিছু ইংরেজি জানা কেরানি তৈরির উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছিল। এটিতে কারিগরি বা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার, মাতৃভাষায় শিক্ষাদান এবং সার্বিক গণশিক্ষার কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না, যা একে চরমভাবে ত্রুটিপূর্ণ করে তুলেছিল।

৩.১১ মোপলা বিদ্রোহের (১৯২১) কারণ কী?
উত্তর: কেরলের মালাবার অঞ্চলে বসবাসকারী মোপলা কৃষকরা মূলত হিন্দু জমিদার (জেনমি) এবং ব্রিটিশ সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, বেআইনি কর আরোপ এবং উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছিল। খিলাফত আন্দোলনের প্রভাবে এই কৃষক বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছিল।

৩.১৩ ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই অক্টোবর বাংলার নারী সমাজ কেন অরন্ধন পালন করে?
উত্তর: ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই অক্টোবর লর্ড কার্জন যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাগ বা বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী করেন, সেদিনটি ছিল জাতীয় শোকের দিন। এই বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ এবং দেশবাসীর প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্যই রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে বাংলার নারী সমাজ ওইদিন বাড়িতে উনুন না জ্বালিয়ে অরন্ধন পালন করেছিলেন।

৩.১৪ ননীবালা দেবী স্মরণীয় কেন?
উত্তর: বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা আগলে রাখা এবং পুলিশের নজর এড়িয়ে অস্ত্র ও তথ্য আদানপ্রদানে সহায়তা করার জন্য বাংলার প্রথম সারির মহিলা বিপ্লবী ননীবালা দেবী স্মরণীয়। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা রাজবন্দী (State Prisoner), যিনি পুলিশের অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেও গোপন তথ্য ফাঁস করেননি।

৩.১৫ সর্দার প্যাটেলকে ‘ভারতের লৌহমানব’ বলা হয় কেন?
উত্তর: স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তাঁর অসীম রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং কঠোর দৃঢ়তার মাধ্যমে জুনাগড়, হায়দ্রাবাদের মতো ৫৫০-এর বেশি দেশীয় রাজ্যকে সদ্য স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তাঁর এই ইস্পাতকঠিন মানসিকতার জন্যই তাঁকে ‘ভারতের লৌহমানব’ বলা হয়।

৩.১৬ কী পরিস্থিতিতে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) গঠিত হয়েছিল?
উত্তর: ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবিতে দক্ষিণ ভারতে প্রবল আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে পৃথক অন্ধ্র রাজ্যের দাবিতে পোট্টি শ্রীরামুলুর অনশনে মৃত্যুর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই উত্তাল পরিস্থিতিতে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্যই ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়েছিল।


বিভাগ ‘ঘ’

৪। সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

উপবিভাগ: ঘ.১

৪.১ ‘উডের নির্দেশনামা’ (১৮৫৪) কে এদেশের শিক্ষা বিস্তারের ‘মহাসনদ’ বলা হয় কেন?
উত্তর:
ভূমিকা: বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে একটি যুগান্তকারী নির্দেশনামা বা ‘Wood’s Despatch’ প্রকাশ করেন। এই নির্দেশনামা ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দিয়েছিল।
মহাসনদ বা ম্যাগনা কার্টা বলার কারণসমূহ:
* প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর: এই নির্দেশনামাতেই সর্বপ্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়।
* মাতৃভাষায় শিক্ষাদান: উডের ডেসপ্যাচ প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় এবং উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদানের সুপারিশ করে, যা ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।
* বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা দপ্তর প্রতিষ্ঠা: এই নির্দেশনামার ফলেই প্রতিটি প্রদেশে একটি করে শিক্ষা দপ্তর (Department of Public Instruction) এবং কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
* নারী শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ: এতে নারী শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের উপরও জোর দেওয়া হয়েছিল।
উপসংহার: চার্লস উডের এই নির্দেশনামাই ছিল আধুনিক ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তিপ্রস্তর। ব্রিটিশ সরকার প্রথমবার শিক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল বলে একে ভারতীয় শিক্ষার মহাসনদ বলা হয়।

৪.২ শ্রীরামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্মসমন্বয়’-এর আদর্শ ব্যাখ্যা কর।
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকের ধর্মীয় ও সামাজিক নবজাগরণের এক উজ্জ্বল প্রাণপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁর সহজ সরল গ্রামীণ উপমার সাহায্যে সর্বধর্মসমন্বয়ের এক অভিনব আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শ:
* যতো মত ততো পথ: শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে ইসলাম, খ্রিষ্টান সহ হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শাখায় সাধন করে উপলব্ধি করেন যে, প্রতিটি ধর্মেরই মূল লক্ষ্য এক এবং অদ্বিতীয় ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো। তিনি এই সত্যটি ব্যক্ত করেন তাঁর বিখ্যাত “যতো মত, ততো পথ” বাণীর মধ্য দিয়ে।
* ঈশ্বরের একত্ব: তিনি বোঝান যে, জলকে কেউ বলে ‘ওয়াটার’, কেউ বলে ‘পানি’, আবার কেউ বলে ‘জল’, কিন্তু বস্তু একটাই। ঠিক তেমনি, ঈশ্বর, আল্লাহ বা গড নাম ভিন্ন হলেও তাঁরা সকলেই একই পরম সত্তা।
* সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা: তাঁর এই আদর্শ ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িক বিভেদকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তিনি দেখিয়েছিলেন যে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা কোনো নির্দিষ্ট মন্দির, মসজিদ বা গির্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
* মানবসেবাই ধর্ম: শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্মসমন্বয়ের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল মানবসেবায়। তিনি বিশ্বাস করতেন জীবে প্রেম করেই ঈশ্বর লাভ সম্ভব (“জীবে দয়া নয়, শিবজ্ঞানে জীব সেবা”)।
উপসংহার: শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সর্বধর্মসমন্বয়ের এই আদর্শ তৎকালীন বাঙালি সমাজকে বিভেদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল এবং স্বামী বিবেকানন্দের হাত ধরে তা সমগ্র বিশ্বকে এক নতুন ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পথ দেখিয়েছিল।

উপবিভাগ: ঘ.২

৪.৩ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব কীরূপ ছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর ও মধ্য ভারতে মহাবিদ্রোহ বা সিপাহি বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ করলেও বাংলার তৎকালীন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এই বিদ্রোহের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি বা সমর্থন প্রদর্শন করেনি।
শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব:
* ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আস্থা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রাধাকান্ত দেবের মতো শিক্ষিত বাঙালিরা ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের আধুনিকীকরণ ও শিক্ষার প্রসারের জন্য কল্যাণকর বলে মনে করতেন।
* প্রগতিশীল বনাম রক্ষণশীল: শিক্ষিত সমাজ সিপাহি এবং বিদ্রোহী জমিদারদের আন্দোলনকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল ও সামন্ততান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে দেখেছিল। তাদের ভয় ছিল, মহাবিদ্রোহ সফল হলে দেশ আবার মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ফিরে যাবে।
* নৈরাজ্যের আশঙ্কা: বিদ্রোহের ফলে সৃষ্ট লুঠতরাজ, হত্যা এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেখে শান্তিপ্রিয় বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ ভীত হয়ে পড়েছিল এবং তারা ব্রিটিশদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
* সংবাদপত্রের ভূমিকা: হিন্দু প্যাট্রিয়ট, সংবাদ প্রভাকর প্রভৃতি পত্রিকায় হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মতো সম্পাদকরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহের নিন্দা করে ব্রিটিশ সরকারকে সমর্থন করেছিলেন।
উপসংহার: সার্বিকভাবে, উনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত বাঙালিরা মহাবিদ্রোহকে নিছকই একটি বিশৃঙ্খল সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে দেখেছিল এবং জাতীয়তাবাদের অভাবের কারণে তারা এই বিদ্রোহ থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রেখেছিল।

৪.৪ ভারত সভার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ‘ভারত সভা’ বা ‘Indian Association’ (১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান।
সুরেন্দ্রনাথের ভূমিকা:
* মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক মঞ্চ: সুরেন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন যে জমিদারদের দ্বারা পরিচালিত সভাগুলি সাধারণ মানুষের দাবি মেটাতে অক্ষম। তাই তিনি আনন্দমোহন বসুকে সাথে নিয়ে একটি মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ভারত সভা প্রতিষ্ঠা করেন।
* সর্বভারতীয় ঐক্য: তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র ভারতবাসীকে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক ছাতার তলায় নিয়ে আসা। এর জন্য তিনি সমগ্র ভারত ভ্রমণ করে জনমত গঠন করেছিলেন।
* সিভিল সার্ভিস আন্দোলন: সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ভারত সভা আই.সি.এস. (I.C.S) পরীক্ষার বয়স কমানোর প্রতিবাদে এক তীব্র সর্বভারতীয় আন্দোলন গড়ে তোলে, যা ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছিল।
* ইলবার্ট বিল বিতর্ক: ইলবার্ট বিল বিতর্কের সময় এবং লর্ড লিটনের অস্ত্র আইন ও সংবাদপত্র আইনের বিরুদ্ধে সুরেন্দ্রনাথ তাঁর ‘বেঙ্গলি’ পত্রিকার মাধ্যমে ভারত সভাকে ব্যবহার করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে তুলেছিলেন।
উপসংহার: জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পূর্বে ভারত সভাই ছিল ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই এটি একটি সর্বভারতীয় গণআন্দোলনের রূপ পেয়েছিল।

উপবিভাগ: ঘ.৩

৪.৫ বারদৌলি সত্যাগ্রহের প্রতি জাতীয় কংগ্রেসের কীরূপ মনোভাব ছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকে বর্ধিত রাজস্বের প্রতিবাদে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে যে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, তা বারদৌলি সত্যাগ্রহ নামে পরিচিত।
জাতীয় কংগ্রেসের মনোভাব ও ভূমিকা:
* পূর্ণ সমর্থন: জাতীয় কংগ্রেস এই সত্যাগ্রহকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, যিনি কংগ্রেসের একজন প্রথম সারির নেতা ছিলেন, তিনিই এই আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং আন্দোলনকে একটি সুশৃঙ্খল অহিংস রূপ দেন।
* গান্ধিজির ভূমিকা: মহাত্মা গান্ধি তাঁর ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় বারদৌলির কৃষকদের দাবিকে সমর্থন করে প্রবন্ধ লেখেন এবং নিজে বারদৌলিতে উপস্থিত হয়ে কৃষকদের মনোবল বৃদ্ধি করেন।
* কংগ্রেস কর্মীদের অংশগ্রহণ: কংগ্রেসের বহু স্বেচ্ছাসেবক ও নারী নেত্রীরা বারদৌলিতে এসে কৃষকদের সাথে একাত্ম হন। তাঁরা কৃষকদের ভয় ভেঙে সরকারকে খাজনা না দেওয়ার জন্য সংঘবদ্ধ করেন।
* জাতীয় স্তরে প্রচার: কংগ্রেসের সাহায্যে এই আঞ্চলিক কৃষক আন্দোলনটি জাতীয় স্তরে একটি প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। কংগ্রেসের চাপে পড়েই ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে বর্ধিত রাজস্বের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হয়েছিল।
উপসংহার: বারদৌলি সত্যাগ্রহ ছিল কংগ্রেসের অহিংস আন্দোলনের একটি অত্যন্ত সফল প্রয়োগ এবং এই আন্দোলনের সাফল্য কংগ্রেসের প্রতি ভারতের কৃষক সমাজের আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করেছিল।

৪.৬ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা কীরূপ ছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন কেবল শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এতে প্রথমবারের মতো বাংলার শ্রমিক শ্রেণিও এক উল্লেখযোগ্য ও স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা পালন করেছিল।
শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা:
* ধর্মঘট ও প্রতিবাদ: বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার প্রতিবাদে হাওড়ার বার্ন কোম্পানি, কলকাতা ট্রামওয়েজ, সরকারি ছাপাখানা এবং পূর্ব রেলওয়ের হাজার হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ করে ধর্মঘট পালন করে, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
* নেতৃত্বের সহায়তা: অশ্বিনীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, চিত্তরঞ্জন দাশ এবং ব্যোমকেশ চক্রবর্তীর মতো জাতীয়তাবাদী নেতারা শ্রমিকদের সংগঠিত করেন এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের মাধ্যমে তাদের আন্দোলনকে একটি রাজনৈতিক রূপ দেন।
* বিদেশি দ্রব্য বর্জন: স্বদেশি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক কারখানার শ্রমিকরা বিদেশি পণ্য ব্যবহার করতে অস্বীকার করে এবং মুটেরা বিদেশি মাল বইতে অরাজি হয়।
* জাতীয় আন্দোলনের সাথে সংযুক্তি: এই আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া (যেমন বেতন বৃদ্ধি, কাজের সময় কমানো) আদায়ের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের সাথে নিজেদের যুক্ত করতে শিখেছিল।
উপসংহার: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির এই ব্যাপক অংশগ্রহণ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যা প্রমাণ করে যে শ্রমিকরাও জাতীয়তাবাদের মূল স্রোতে শামিল হতে প্রস্তুত।

উপবিভাগ: ঘ.৪

৪.৭ জুনাগড় রাজ্যটি কীভাবে ভারতভুক্ত হয়?
উত্তর:
ভূমিকা: স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে গুজরাটের কাথিয়াবাড় উপদ্বীপে অবস্থিত জুনাগড় রাজ্যের ভারতভুক্তি একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারণ এখানকার নবাব ছিলেন মুসলিম এবং বেশিরভাগ প্রজা ছিলেন হিন্দু।
ভারতভুক্তির প্রক্রিয়া:
* নবাবের সিদ্ধান্ত: ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট জুনাগড়ের নবাব মহাবত খান প্রজাদের মতামতকে উপেক্ষা করে হঠাৎ পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন, যা জুনাগড়ের হিন্দু প্রজাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
* প্রজাদের বিদ্রোহ ও আরজি হুকুমত: নবাবের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে হিন্দু প্রজারা ব্যাপক বিদ্রোহ শুরু করে এবং শ্যামলদাস গান্ধীর নেতৃত্বে ‘আরজি হুকুমত’ বা অস্থায়ী সরকার গঠন করে নবাবের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে।
* নবাবের পলায়ন: প্রজাদের ক্ষোভ এবং ভারতের চাপের মুখে ভীত হয়ে জুনাগড়ের নবাব প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান।
* গণভোট ও ভারতভুক্তি: নবাব পালিয়ে যাওয়ার পর জুনাগড়ের দেওয়ান ভারত সরকারকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী জুনাগড় দখল করে এবং ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়। গণভোটে প্রায় ৯৯% মানুষ ভারতে যোগদানের পক্ষে মত দিলে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে ফেব্রুয়ারি জুনাগড় পাকাপাকিভাবে ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
উপসংহার: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের দৃঢ় পদক্ষেপ এবং জুনাগড়ের সাধারণ মানুষের প্রবল ইচ্ছাশক্তির ফলেই জুনাগড়কে ভারতের মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

৪.৮ উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে ভারত সরকার কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করে?
উত্তর:
ভূমিকা: দেশভাগের পর পাকিস্তান থেকে আসা লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও শিখ ছিন্নমূল মানুষের স্রোত স্বাধীন ভারতের কাছে এক ভয়াবহ ‘উদ্বাস্তু সমস্যা’ তৈরি করেছিল। এই চরম মানবিক সংকট মোকাবিলায় ভারত সরকার একাধিক জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করে।
ভারত সরকারের উদ্যোগ:
* ত্রাণশিবির স্থাপন: সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে গৃহহীন ও সর্বস্বান্ত উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য পাঞ্জাব, দিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বিশাল বিশাল ত্রাণশিবির বা ক্যাম্প স্থাপন করে এবং তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।
* পুনর্বাসন দপ্তর গঠন: উদ্বাস্তুদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের জন্য ভারত সরকার একটি পৃথক ‘উদ্বাস্তু পুনর্বাসন মন্ত্রক’ গঠন করে। এই দপ্তরের মাধ্যমে উদ্বাস্তুদের কর্মসংস্থান এবং বসতি স্থাপনের কাজ পরিচালিত হয়।
* জমি ও ঋণ প্রদান: সরকার উদ্বাস্তুদের কৃষিকাজের জন্য জমি, বাসস্থান তৈরির জন্য প্লট এবং ব্যবসা শুরু করার জন্য সহজ শর্তে আর্থিক ঋণ প্রদান করে। অনেক নতুন কলোনি ও উপনগরী তৈরি করে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়া হয়।
* নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি: পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ঢল সামলাতে এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষার জন্য ভারত সরকার ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের সাথে ‘নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি’ বা দিল্লি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
উপসংহার: সরকারের এই বিশাল উদ্যোগ সত্ত্বেও, বিশেষত পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য, যা কয়েক দশক ধরে ভারতের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল।


বিভাগ ‘ঙ’

৫। পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

৫.১ উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সতীদাহ প্রথা বিরোধী প্রচেষ্টাগুলির পরিচয় দাও। রামমোহন রায় কী ভাবে সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনকে সাফল্যমণ্ডিত করেন?
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকে ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে অমানবিক ও বীভৎস প্রথা ছিল ‘সতীদাহ প্রথা’। হিন্দু বিধবাদের স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারার এই প্রথার বিরুদ্ধে রামমোহন রায়ের চূড়ান্ত সাফল্যের আগে বহু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
সতীদাহ প্রথা বিরোধী প্রাথমিক প্রচেষ্টা:
* আঠারো শতকের শেষে এবং উনিশ শতকের শুরুতে শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়াম কেরি সর্বাগ্রে এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। তিনি এই প্রথা রদ করার জন্য সরকারের কাছে বহুবার আবেদন করেন।
* অনেক ব্রিটিশ সিভিলিয়ান এবং ম্যাজিস্ট্রেট ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই নিষ্ঠুর প্রথা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন।
* মারাঠা পেশোয়া, পর্তুগিজ শাসক এবং ফরাসিরা তাদের শাসিত অঞ্চলে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করার আংশিক চেষ্টা করেছিল।
* হিন্দু পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার সর্বপ্রথম শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে হিন্দু ধর্মে সতীদাহ প্রথার কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশ নেই, যা রামমোহনের পরবর্তী কাজের ভিত্তি তৈরি করেছিল।

রামমোহন রায়ের সতীদাহ বিরোধী আন্দোলন ও সাফল্য:
* শাস্ত্রীয় যুক্তি প্রদর্শন: রাজা রামমোহন রায় অত্যন্ত গভীরভাবে হিন্দু শাস্ত্র অধ্যয়ন করে প্রমাণ করেন যে বেদ, মনুসংহিতা বা অন্যান্য প্রাচীন শাস্ত্রে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর ব্রহ্মচর্য পালনের কথা বলা হয়েছে, সতীদাহের নয়। তিনি শাস্ত্রীয় যুক্তিতে রক্ষণশীল হিন্দুদের পরাস্ত করেন।
* জনমত গঠন: তিনি ‘সংবাদ কৌমুদী’ পত্রিকা এবং নিজের রচিত পুস্তিকাগুলির মাধ্যমে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে জোরালো প্রচার চালান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করেন।
* সরাসরি বাধা দান: রামমোহন তাঁর অনুগামীদের নিয়ে কলকাতার শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে বেড়াতেন এবং সতীদাহ হতে দেখলে শাস্ত্রীয় যুক্তি দিয়ে আত্মীয়স্বজনদের বুঝিয়ে নিরস্ত করার চেষ্টা করতেন।
* লর্ড বেন্টিঙ্ককে সহায়তা: ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক যখন সতীদাহ প্রথা রদ করার উদ্যোগ নেন, তখন রামমোহন রায় তাঁকে সমস্ত রকম তথ্য ও শাস্ত্রীয় প্রমাণ দিয়ে সাহায্য করেন এবং রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে তাঁকে সাহস জোগান।
* চূড়ান্ত আইন পাস: শেষ পর্যন্ত রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং জনমত গঠনের ফলেই লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর সপ্তদশ রেগুলেশন (Regulation XVII) পাস করে সতীদাহ প্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেন।
উপসংহার: রাজা রামমোহন রায়ের যুক্তিবাদী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলেই শত শত নিরপরাধ নারীর প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল। সতীদাহ প্রথা রদ ছিল ভারতীয় সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে তাঁর এক অবিস্মরণীয় কীর্তি।

৫.২ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাচিন্তা ও শান্তিনিকেতন ভাবনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তর:
ভূমিকা: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মহান শিক্ষাবিদ। ব্রিটিশ প্রবর্তিত যান্ত্রিক, আনন্দহীন ও কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি নিজস্ব এক মুক্ত এবং সৃজনশীল শিক্ষাদর্শের প্রবর্তন করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার বৈশিষ্ট্য:
* প্রকৃতির কোলে শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে মানুষের প্রকৃত বিকাশ চার দেওয়ালের মধ্যে সম্ভব নয়। শিক্ষা হতে হবে প্রকৃতির উদার কোলে, খোলা আকাশের নিচে, যেখানে শিশু গাছপালা, পশুপাখি এবং প্রকৃতির সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে।
* আনন্দময় শিক্ষা: তাঁর মতে শিক্ষা কোনো ভীতিকর বা মুখস্থ করার বিষয় নয়, শিক্ষা হবে আনন্দময়। খেলাধুলা, গানবাজনা, নাটক এবং শিল্পের মাধ্যমে শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিখবে।
* মাতৃভাষায় শিক্ষাদান: তিনি সর্বদাই মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের পক্ষে সওয়াল করতেন। তাঁর মতে, মাতৃভাষা হলো মাতৃদুগ্ধের মতো, তাই মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিশুর সবচেয়ে দ্রুত ও স্বাভাবিক জ্ঞানবিকাশ সম্ভব।
* পল্লী উন্নয়ন ও কর্মমুখী শিক্ষা: শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা নয়, তিনি ছাত্রদের গ্রামীণ শিল্পের সাথে যুক্ত করে কর্মমুখী এবং আত্মনির্ভরশীল শিক্ষাদানের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

শান্তিনিকেতন ভাবনা ও প্রতিষ্ঠা:
* ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা: নিজের শিক্ষাচিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ বা একটি আদর্শ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
* মুক্ত পরিবেশ: এখানে কোনো বদ্ধ শ্রেণিকক্ষ ছিল না; গাছের তলায়, প্রকৃতির উন্মুক্ত পরিবেশে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে মধুর সম্পর্কের ভিত্তিতে শিক্ষাদান চলত।
* বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা: ধীরে ধীরে এই শান্তিনিকেতন দেশ-বিদেশের জ্ঞানচর্চার একটি মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে তা ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় রূপে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।
উপসংহার: রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার মূল সুরই ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের এবং মানুষের সাথে মানুষের আধ্যাত্মিক ও আত্মিক মিলন ঘটানো। শান্তিনিকেতন ছিল তাঁর এই সুমহান মানবিক ও মুক্ত শিক্ষাদর্শের এক মূর্ত প্রতীক।

৫.৩ বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণের ‘চণ্ডাল’ সম্প্রদায় যে শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তা নমঃশূদ্র আন্দোলন নামে পরিচিত।
আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট:
* মূলত পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ, যশোর, খুলনা (বর্তমান বাংলাদেশ) অঞ্চলে বসবাসকারী এই দরিদ্র কৃষক সম্প্রদায় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা সামাজিকভাবে চরম অস্পৃশ্য এবং অবহেলিত ছিল।
* শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং অর্থনৈতিকভাবে শোষিত এই সম্প্রদায় তাদের সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং সরকারি সুযোগসুবিধা আদায়ের জন্যই এই আন্দোলনের সূত্রপাত করে।

আন্দোলনের বিকাশ ও পর্যায়ক্রম:
* মতুয়া ধর্ম আন্দোলন: নমঃশূদ্র আন্দোলনের প্রথম পর্যায় শুরু হয় শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর এবং তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে। তাঁরা ‘মতুয়া’ নামক এক নতুন ধর্মীয় আদর্শ প্রচার করেন, যা জাতপাত ও অস্পৃশ্যতা দূর করে নমঃশূদ্রদের মধ্যে এক অদ্ভুত সামাজিক ঐক্য ও আত্মসম্মানবোধ তৈরি করেছিল।
* শিক্ষা বিস্তার: গুরুচাঁদ ঠাকুর উপলব্ধি করেছিলেন যে শিক্ষা ছাড়া সামাজিক মুক্তি অসম্ভব। তাই তিনি মিশনারিদের সহায়তায় নমঃশূদ্রদের জন্য বহু বিদ্যালয় স্থাপন করে তাদের শিক্ষিত করার উদ্যোগ নেন।
* রাজনৈতিক অধিকার আদায়: বিশ শতকে এই আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। মুকুন্দবিহারী মল্লিক, প্রমথরঞ্জন ঠাকুর প্রমুখ নেতার নেতৃত্বে নমঃশূদ্ররা কংগ্রেসের ব্রাহ্মণ আধিপত্যের বিরোধিতা করে এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে সরকারি চাকরি ও আইনসভায় নিজেদের জন্য সংরক্ষণ দাবি করে।
* সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা: নমঃশূদ্রদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফলে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ‘সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা’ নীতিতে তারা তফসিলি জাতি (Scheduled Caste) হিসেবে পৃথক নির্বাচনের অধিকার লাভ করে, যা ছিল তাদের আন্দোলনের একটি বড় সাফল্য।
উপসংহার: বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলন ছিল শুধুমাত্র জাতপাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়, এটি ছিল একটি পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের এক সফল সংগ্রাম।


বিভাগ ‘চ’ (কেবলমাত্র বহিরাগত পরীক্ষার্থীদের জন্য)

৬.১ একটি পূর্ণ বাক্যে উত্তর দাও:

৬.১.১ ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক কে ছিলেন?
উত্তর: ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ।

৬.১.২ ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ইংরাজিতে কে অনুবাদ করেন?
উত্তর: ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ইংরাজিতে অনুবাদ করেছিলেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

৬.১.৩ এশিয়াটিক সোসাইটি কোন বছর প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: এশিয়াটিক সোসাইটি ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে স্যার উইলিয়াম জোন্স কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়।

৬.১.৪ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য কে ছিলেন?
উত্তর: বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

৬.১.৫ দীপালি সংঘ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
উত্তর: ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় লীলা রায় (লীলা নাগ) ‘দীপালি সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

৬.১.৬ পুনা চুক্তি (১৯৩২) কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল?
উত্তর: পুনা চুক্তি (১৯৩২) মহাত্মা গান্ধি এবং ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

৬.২ দু’টি বা তিনটি বাক্যে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

৬.২.১ ‘মেকলে মিনিট’ কী?
উত্তর: ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারি জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ভারতে পাশ্চাত্য বা ইংরেজি শিক্ষাদানের সপক্ষে যে জোরালো প্রস্তাব বা নির্দেশনামা সরকারের কাছে পেশ করেছিলেন, তা ‘মেকলে মিনিট’ নামে পরিচিত।

৬.২.২ তিতুমির স্মরণীয় কেন?
উত্তর: তিতুমির বা মীর নিসার আলি বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি চব্বিশ পরগনা ও নদিয়া অঞ্চলে অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে নারকেলবেড়িয়ায় ‘বাঁশের কেল্লা’ নির্মাণ করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহিদ হয়েছিলেন বলে স্মরণীয়।

৬.২.৩ পঞ্চানন কর্মকার কে ছিলেন?
উত্তর: পঞ্চানন কর্মকার ছিলেন একজন সুদক্ষ বাঙালি স্বর্ণকার। তিনি চার্লস উইলকিন্সের সহায়তায় প্রথম সুন্দর ও নিখুঁত বাংলা মুদ্রাক্ষর বা টাইপ তৈরি করে বাংলা মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন।

৬.২.৪ ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির গুরুত্ব কী?
উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক অঙ্কিত ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের সময় পরাধীন ভারতবাসীর মনে এক তীব্র জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি ও আত্মত্যাগের প্রেরণা জাগিয়ে তুলতে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিল।

৬.২.৫ ‘নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি’ (১৯৫০) কেন স্বাক্ষরিত হয়?
উত্তর: দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও শিখ উদ্বাস্তুদের স্রোত সামলানো এবং ভারত ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলি খানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top